গর্ভাবস্থায় তেঁতুল খাওয়া যাবে কি? খাওয়ার নিয়ম, উপকারিতা ও অপকারিতা | Food & Fitness

গর্ভাবস্থায় তেঁতুল খাওয়া যাবে কি? খাওয়ার নিয়ম, উপকারিতা ও অপকারিতা

গর্ভাবস্থায় তেঁতুল খাওয়া যাবে কি? যারা আমাদের কাছে এ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, তাদের জন্য আজকের এই পোস্ট। হ্যাঁ, গর্ভাবস্থায় তেঁতুল খাওয়া যাবে, তবে নিয়ম মেনে খেতে হবে তাহলে অনেক উপকার পাবেন। এখানে আমরা এসব বিষয়ে আলচনা করব, সেই সাথে অতিরিক্ত খাওয়ার অপকারিতা ও জানতে পারবেন।

তেঁতুল ভিটামিন সি-তে সমৃদ্ধ একটি টক জাতীয় ফল, যা এশিয়া মহাদেশে বহুল পরিচিত।গর্ভাবস্থায় নারীদের এই তেঁতুল অনেক বেশি প্রিয় হয়ে থাকে। এটি গর্ভবতী নারীদের অনেক উপকারে আসে। এতে রয়েছে এন্টিঅক্সিডেন্ট, প্রোটিন, ভিটামিন সি, যা দেহের বৃদ্ধিতে নানা ভাবে কাজ করে। কিন্তু অধিক মাত্রায় তেঁতুল খাওয়া ঠিক নয়। তেঁতুল খাওয়ার নিয়ম, এর উপকারিতা, কিছু সতর্কতা রয়েছে যা আমরা এই পোস্টে আলোচনা করবো।

গর্ভাবস্থায় তেঁতুল খাওয়ার নিয়ম

১. গর্ভাবস্থায় পরিমিত পরিমানে তেঁতুল খেতে হবে। অত্যাধিক সবকিছুই খারাপ। এটি বেশি খেলে আপনার গ্যাসের সমস্যা, বদহজম হতে পারে।

২. প্রতিদিন ১০ গ্রাম এর বেশি তেঁতুল খাবেন না।

৩. সকালে খালিপেটে তেঁতুল খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

৪. তেঁতুল খাওয়ার উপযুক্ত সময় হলো খাবার গ্রহণ এর আধ ঘন্টা পর।

৫. তেঁতুল খাওয়ার সময় তাতে কাচা লবণ, মরিচ মিক্স করে খাবেন না। তেঁতুল ব্লাড প্রেশার কমালেও লবণ ব্লাড প্রেশার বাড়িয়ে দিতে পারে। আগে থেকে বানানো তেঁতুল এর আচার ও তেমন উপকারী না। আপনি চাইলে খেজুর পানিতে ভিজিয়ে এর পানি খেতে পারেন।

৬. যদি খালি তেঁতুল একদম ই ভালো না লাগে তাহলে এর সাথে বিট লবণ বা পিংক সল্ট এড করে নিতে পারেন।

৭. কাঁচা তেঁতুল খাবেন না বরং গাছপাকা হালকা বাদামী রংয়ের তেঁতুল খাবেন।

৮. তেঁতুল খাওয়ার আগে ভালোভাবে দেখে নিবেন এর ভিতরে কোন পোকা আছে কিনা এবং তেঁতুলটি ফ্রেশ কিনা। একদম টাটকা তেঁতুল খাওয়ার চেষ্টা করবেন।

আরো পড়ুনঃ গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা, মাস অনুযায়ী ডায়েট প্ল্যান, গর্ভাবস্থায় বাচ্চার ওজন চার্ট ওবং ওজন বৃদ্ধি

গর্ভাবস্থায় তেঁতুল খাওয়ার উপকারিতা

১. ইমিউন সিস্টেমকে ত্বরান্বিত করে

তেঁতুলে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে সচল রাখে। এটি শরীর থেকে টক্সিন এবং দূষিত পদার্থগুলোকে বের করে দেয় এবং বিশুদ্ধ অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত সরবরাহ করে গর্ভের শিশুকে। যা শিশুকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

২. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে

গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস গর্ভবতী মায়ের কোষ্ঠ কাঠিন্য সমস্যায় অনেক তীব্র থাকে। এসময় যদি আপনি নিয়মিত তেঁতুল তাহলে তা আপনার কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা অনেকটাই দূর করতে সহায়তা করবে। এতে বিদ্যমান কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে সহায়তা করে। এবং আপনার হজম প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।

৩. গ্যাস এসিডিটি থেকে মুক্তি দেয়

যেহেতু তেঁতুলে ভিটামিন সি জাতীয় উপাদান রয়েছে তাই অনেকের ধারণা হতে পারে যে এটি খেলে গ্যাস এর সমস্যা বেড়ে যাবে। কিন্তু এই ধারণা টি ভুল। তেঁতুলে বিদ্যমান পুষ্টি গুন গ্যাস এসিডিটির সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে।

৪. হাই ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখে

যাদের আগে থেকে ব্লাড প্রেশার বেশি থাকে তারা গর্ভাবস্থায় আরো বেশি ঝুকির মুখে পড়ে যান।ব্লাড প্রেশার বেশি হলে প্রসবের সময় মায়ের একলামশিয়া দেখা দিতে পারে। যেটি তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসময় সাধারণত অনেক গর্ভবতী মায়ের রক্তের উঠানামা বেশি বেড়ে যায়।এইসবই ঘটে কিছু হরমোনাল পরিবর্তন এর কারণে। তেঁতুলে বিদ্যমান পটাশিয়াম ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

৫. আয়রন এর ঘাটতি কমায়

গর্ভাবস্থায় একটি সাধারন ওষুধ সব গর্ভবতী মায়েদের ডাক্তার প্রেসক্রাইব করে থাকেন। সেটি হল আয়রন ট্যাবলেট। আপনার গর্ভের শিশু কে নানা জন্মগত ত্রুটি থেকে রক্ষা করতে পারে এই আয়রন।

অনেকের শরীরে আয়রনের ঘাটতি প্রচুর পরিমাণে দেখা দেয় যা শুধুমাত্র ট্যাবলেট দিয়ে তা পূরণ হয়না। পাশাপাশি ফলমূল এবং আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার প্রয়োজন হয়। সে সময় আপনি তেতুল আপনার খাবারের তালিকায় যোগ করে রাখতে পারেন। তেঁতুলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন যা শরীরে আয়রন এর ঘাটতি পূরণ করতে সহায়তা করে।

আরো পড়ুনঃ নরমাল ডেলিভারি হওয়ার উপায় এবং করণীয়

৬. বমিভাব ও মর্নিং সিকনেশ দূর করে

গর্ভাবস্থায় বমিভাব বা মর্নিং সিকনেশ, খাওয়ায় অরুচি প্রথম তিনমাসের একটি সাধারণ লক্ষণ।কিন্তু এর জন্য গর্ভবতী মা ভালো ভাবে খাওয়া দাওয়া করতে পারেন না।তা শরীর প্রচন্ড খারাপ হতে থাকে।এসময় সকালে নাস্তার পর যদি অল্প করে তেঁতুল খান তাহলে কিছুটা স্বস্তি বা আরাম বোধ করতে পারেন।কিন্তু অবশ্যই খেয়াল রাখবেন সকালে মেডিসিন থাকলে সেটি গ্রহণের ১-২ ঘন্টা আগে বা পরে তেঁতুল খাবেন।

৭. ব্লাড সুগার ও ব্লাড গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখে

যদি গর্ভাবস্থায় আগে থেকেই ডায়াবেটিস থেকে তাকে কিংবা গর্ভকালীন টাইপ টু ডায়াবেটিসের সমস্যায় ভুগে থাকেন তাহলে এই সময় তেঁতুল খেতে পারেন। তেতুল খেলে ডায়াবেটিস এবং আগে থেকে যাদের ডায়াবেটিস আছে তা সহজেই কন্ট্রোল করা যায়।

গর্ভাবস্থায় তেঁতুল খাওয়ার অপকারিতা

গর্ভাবস্থায় তেঁতুল খাওয়ার বড় ধরনের কোনো সাইড ইফেক্ট বা সমস্যা না থাকলেও কখনো কখনো সব মায়েদের শরীর তা গ্রহণ করার মতো অবস্থান এ থাকেন না।তখন শারীরিক অবস্থা বুঝেই তেঁতুল খাওয়া উচিত।

অত্যধিক মাত্রায় তেঁতুল খেলে তা গ্যাস, এসিডিটি, বদহজম এর সৃষ্টি করতে পারে।

সকাল বেলা খালি পেটে খাওয়া যাবেনা এতে আপনার পেট ব্যথা সহ নানা রকমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অনেকের তেঁতুল খাওয়ার পর বুক জ্বালাপোড়া, মাথা ব্যথা, পেটে গ্যাস হওয়া, মুখ দিয়ে লালা পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমন সমস্যা দেখা দিলে বুঝতে হবে তাদের শরীরে তেঁতুল এলার্জির সমস্যা সৃষ্টি করছে। সেক্ষেত্রে তেঁতুল খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন।

গর্ভাবস্থায় তেঁতুল খাওয়ার কিছু সতর্কতা

১. আপনি প্রতিদিন ১০ গ্রাম পর্যন্ত তেঁতুল খেতে পারেন। এটি বেশি খেলে আপনার গ্যাস্ট্রিক এসিডিটির সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।

২. যখনই আপনি তেঁতুল খাবেন, খাবার খাওয়ার আধাঘন্টা পরে খেতে হবে।

৩. পুরনো তেলে বানানো বাহিরের বিভিন্ন ধরনের তেঁতুলের আচার খাওয়া থেকে দূরে থাকুন। এতে আপনার গর্ভের বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে।

৪. যাদের ব্লাড প্রেশার কম থাকে তারা তেঁতুল খাবেন না।

৫. গর্ভাবস্থায় আপনার যদি এসপিরিন জাতীয় ঔষধ খেতে হয় তাহলে আপনি তেঁতুল খাওয়া থেকে দূরে থাকুন। গর্ভাবস্থায় যদি কেউ আয়রন, ক্যালসিয়াম ভিটামিন জাতীয় ঔষধ খেয়ে থাকেন, যে বেলায় সেই ঔষধ খাচ্ছেন সেই বেলায় ঔষধ সেবনের ২ ঘন্টা আগে ও পরে তেঁতুল খাবেন না।

৬. অনেকেই দেখা যায় এন্টিবায়োটিক ঔষধ খাচ্ছেন। যতদিন এন্টিবায়োটিক ঔষধ সেবন করছেন ততদিন ভিটামিন সি জাতীয় ফল ও তেঁতুল খাওয়া একেবারেই বন্ধ করে দিন। অন্যথায় ক্ষতিকারক হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় তেঁতুল খাওয়ার খুব বেশি অপকারিতা না থাকলেও কিছু সর্তকতা অবলম্বন করে এটি খেলে এর সর্বাধিক উপকারিতা লাভ করা যায়। এ কারণে গর্ভবস্থায় মায়ের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে, প্রয়োজনবোধে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তেঁতুল খাদ্যতালিকায় যোগ করতে পারেন।এবং নিয়ম করে সময়মতো খাওয়ার ফলে এর সুবিধাগুলোও গর্ভবতী মা ও তার শিশু লাভ করতে পারে।

আরো পড়ুনঃ

5/5 - (11 Reviews)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *