ধূমপানের অপকারিতা এবং ছাড়ার উপায়

সিগারেট একটি পণ্য যা ধূমপানের জন্য গ্রহণ করা হয়। তামাক পাতা সুন্দর করে কেটে পরিশোধন করার পর তার সাথে আনুষঙ্গিক কয়েকটি উপাদান মিশিয়ে কাগজে মোড়ানো সিলিন্ডারের ভিতর পুড়ে সিগারেট তৈরি করা হয়। একটি প্রতিরূপ সিগারেটের সিলিন্ডারের দৈর্ঘ্য ১২০ মিলিমিটার এবং ব্যাস ১০ মিলিমিটার।

সিগারেটের এক প্রান্তে আগুন জ্বালিয়ে অন্য প্রান্তে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হয়। যে প্রান্তে মুখ দিতে হয় সে প্রান্তে সচরাচর বিশেষ ফিল্টার থাকে। সিগারেট হোল্ডার দিয়েও অনেকে ধূমপান করে থাকেন। সিগারেট বলতে সাধারণত তামাকের তৈরি সিগারেট বোঝানো হলেও বিশেষভাবে এটি যেকোন ধরনের উপাদানকে নির্দেশ করে। যেমন, গাঁজা দিয়েও সিগারেট তৈরি হতে পারে।

মানুষ কেন সিগারেট খায়? আজব প্রশ্ন! এ প্রশ্নের উত্তর নিজের মত করে দেবো। আগে ধূমপানের ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নেয়া আবশ্যক!

ধূমপানের ইতিহাস

ইউরোপিয়ানদের মধ্যে বিখ্যাত নাবিক এবং আবিষ্কারক ক্রিস্টোফার কলম্বাসই প্রথম তামাক গাছ দেখেন। ১৪৪২ সালে কলম্বাস যখন সান সালভাদরে গিয়ে পৌঁছান তখন সেখানকার আদিবাসীরা মনে করেছিলো কলম্বাস ঈশ্বর প্রেরিত স্বর্গীয় জীব! তারা কলম্বাসকে উপহার স্বরূপ কাঠের তৈরি যুদ্ধাস্ত্র, বন্য ফলমূল এবং শুকনো তামাক পাতা দিয়েছিলো। অন্যান্য উপহার গুলো নিলেও কলম্বাস ধূমপান না করে তামাক পাতা গুলো ফেলে দিয়েছিলো।

ঠিক ঐ বছরই আরেকজন ইউরোপিয়ান রডরিগো ডি যেরেয (Rodrigo de Jerez) কিউবায় গিয়ে পৌঁছান এবং ইউরোপিয়ান হিসাবে তিনিই প্রথম ধূমপান করেছিলেন। রডরিগো ডি যেরেয ছিলেন স্পেনের নাগরিক। পরবর্তীতে স্পেনে ফিরে গিয়ে তিনি জনসম্মুখে ধূমপান করে মানুষজনকে চমকে দিতেন।

এক জন মানুষের নাক এবং মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে এটা দেখে সাধারন মানুষ ভড়কে যেত। একটা সময় অনেকেই ভাবতে শুরু করে যে রডরিগো ডি যেরেযের উপর শয়তান ভর করেছে। তাই রডরিগোকে ৭ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়! কারাগারে রডরিগোর সাথে থেকে অনেকেই ধূমপান শুরু করেন।

তামাক এবং পাইপের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। একসময় জন্ম হয় সিগারেটের। সিগারেট আস্তে আস্তে সবার কাছে গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠে।

১৮১৫ সালে সিগারেট ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়। এমনকি দি হাউস অফ পার্লামেন্টেও সিগারেট খাওয়ার জন্য আলাদা রুম করা হয়। ১৮২৮ সালে নিকোটিনের পিওর ফর্ম আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। কিছুদিনের মধ্যেই সবাই বুঝতে পারে এটা মারাত্মক বিষ! ১৮৫২ সাল থেকেই ধূমপান করার সুবিধার্থে ম্যাচ বা দিয়াশলাই এর প্রচলন হয়।

১৮৫৬ সালে ক্রিমিয়ান যুদ্ধ ফেরত সৈন্যরা তুর্কি থেকে সিগারেট নিয়ে আসে। সৈনিকদের মাঝে সিগারেট অনেক জনপ্রিয় হয়ে পড়ে। অলসতা এবং বিষাদ দূর করার জন্য তখন সৈন্যদেরকে নিয়মিত সিগারেট সরবরাহ করা হতো। ১৮৬৫ সালে আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনার ওয়াশিংটন ডিউক নামের এক ব্যাক্তি প্রথম সিগারেট রোল করে বিক্রি করা শুরু করে।

১৮৮৩ সালেজেমস বনস্যাক প্রথম সিগারেট রোল করার মেশিন আবিষ্কার করেন। এই মেশিন দিয়ে দিনে ১০০০ সিগারেট তৈরী করা যেত। বনস্যাক একটা সিগারেট কোম্পানী শুরু করেন যার নাম ছিলো আমেরিকান টোবাকো কোম্পানী। বনস্যাকের মেশিন সিগারেট শিল্পে বিপ্লবের সূচনা করে। তামাক চাষ এবং সিগারেট প্রস্তুত প্রক্রিয়ার উন্নতির সাথে সাথে সিগারেট ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯১৬ সালে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় আর্মিদের রেশনের সাথে সিগারেটও যুক্ত করা হয়। ১৯৫০ সালে সিগারেটের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে প্রথম প্রচারনা শুরু হয়। এই সময়ই ধূমপান এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কার করা হয়। ড. ওয়াইন্ডার এবং ড. গ্রাহাম একটি গবেষণায় দেখান যে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত ৯৫% মানুষই ২৫ বছর বা তার বেশী সময় ধরে ধূমপানে আসক্ত।

এবার আশা যাক কেন মানুষ সিগারেট খায় এ প্রসঙ্গে! বেশিরভাগ কিশোর বা যুবক সিগারেট খায় হতাশার কারনে। নিজেকে কষ্ট দিয়ে তারা আনন্দ পেতে চায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যারা নিয়মিত সিগারেট খায় , তাদের জীবনে একটা খারাপ অতীত থাকে। অতীতের কষ্ট বাষ্প করে দিতে সিগারেটে টান ধরায়। আদৌ কি কষ্ট লাঘব হয়? সম্ভবত না। আবার এক ধরনের মানুষ সিগারেট খায় শখের বশে! তাদের ধারনা সিগারেট না খেলে স্মার্ট হওয়া যায় না।

যাই হোক, যারা সিগারেট খায় তারা এক সময় আফসোস করে। যদি আপনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তবে বলব হতাশা কাটাতে বই পড়েন, ঘুরতে যান, ধর্মীয় কাজে লিপ্ত হন। সিগারেট খাবার দরকার কি! আর যদি আপনি শখের বশে সিগারেট খান, তবে বলব আপনি ভুলের জগতে আছেন। কিছু কিছু লোক আছেন যারা এ খারাপ ত্যাগ করতে চাচ্ছেন কিন্তু পারছেন না। তাদের উচিত হবে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা।

See also  Repairable sneakers, design tweaks that make resoling and restitching viable

আরো পড়ুনঃ দারুচিনির উপকারিতা ও অপকারিতা এবং ব্যবহারবিধি, কিসমিসের উপকারিতা ও অপকারিতা এবং খাওয়ার নিয়ম

তামাকজাত ধূমপানের অপকারিতা কি কি

যারা ধূমপান করেন, এমনকি যারা আগে ধূমপান করতেন এবং এখন ছেড়ে দিয়েছেন, তারাও অধূমপায়ীদের চেয়ে বেশি শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেন বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

২ লাখ ২০ হাজার মানুষ নিয়ে চালানো ইউসিএলের এক নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য।

এর কারণ নিশ্চিতভাবে না জানলেও গবেষকরা ধারণা করছেন কোনো সময়ে নিয়মিত ধূমপান করার ফলে শরীরে পাকাপাকিভাবে পরিবর্তন আসতে পারে।

২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে বিবিসি’র একটি অনলাইন জরিপে অংশ নেয়া মানুষের তথ্য উপাত্ত দিয়ে তৈরি করা হয়েছে গবেষণাটি।

গবেষণায় অংশ নেয়া মানুষকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে:

  • কখনো নিয়মিত ধূমপান করেন নি
  • একসময় নিয়মিত ধূমপান করতেন
  • বর্তমানে নিয়মিত ধূমপান করেন

তাদের শারীরিক যন্ত্রণার পরিমাণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের উত্তরের ভিত্তিতে তৈরি করা শুন্য থেকে ১০০ পর্যন্ত একটি স্কেলে সেই উত্তর বসানো হয়।

যারা কখনো ধূমপান করেননি, তাদের চেয়ে বর্তমান ও সাবেক ধূমপায়ীরা গড়ে ১ থেকে ২ পয়েন্ট বেশি পান, অর্থাৎ তাদের শারীরিক যন্ত্রণার হার অধূমপায়ীদের চেয়ে বেশি।

অথবা বলা যায়, ধূমপান ছেড়ে দিলেও ভবিষ্যতে এই অভ্যাসের কারণে শারীরিক যন্ত্রণা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

গবেষকদের একজন ডক্টর ওলগা পারস্কি বিবিসিকে বলেন, “গবেষণার প্রধান আবিষ্কার হলো, সাবেক ধূমপায়ীরাও অপেক্ষাকৃত বেশি শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে জীবনযাপন করেন।”

“কিন্তু এটি চিকিৎসাগত দিক থেকে অর্থবহ কি-না, সেটি এখনও নিশ্চিত না।”

ধূমপানের সাথে শারীরিক যন্ত্রণার কী সম্পর্ক সেবিষয়ে এখনো নিশ্চিত না বিজ্ঞানীরা।

একটি ধারণা রয়েছে যে সিগারেটে যে কয়েক হাজার ধরণের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি টিস্যুর ক্ষতি করে – যার ফলে শরীরে ব্যাথা তৈরি হয়।

আরেকটি ধারণা রয়েছে যে শরীরের হরমোনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে ধূমপান।

তবে এমন সম্ভাবনাও থাকতে পারে যে ধূমপান আসলে ব্যাথার কারণ নয়, উপসর্গ মাত্র।

এরকম ধারণার কারণ হলো, বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিরা তীব্র ব্যাথা বোধ করেন বা তাদের ধূমপানের সম্ভাবনা বেশি – গবেষণায় এর প্রমাণও পাওয়া গেছে।

সুতরাং এমন হতেও পারে যে, যে ধরণের মানুষের ব্যাথার কথা প্রকাশ করার সম্ভাবনা বেশি, সেই ধরণের মানুষের ধূমপায়ী হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।

তবে গবেষক ডক্টর পারস্কি বলছেন শরীরে তীব্র ব্যাথা এবং পিঠে ব্যাথার সাথে ধূমপানের সম্পর্ক আছে, গবেষণা এর আগেও এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ধূমপান বিরোধী ক্যাম্পেইন গ্রুপ অ্যাশ’এর প্রধান নির্বাহী ডেবোরাহ আরনট বলেন, “১৯৫০ সালে প্রথম আবিষ্কৃত হয় যে ধূমপানের সাথে ফুসফুসের ক্যান্সারের সম্পর্ক রয়েছে। এরপর গত কয়েকদশক যাবত হওয়া নানা গবেষণায় উঠে এসেছে যে, প্রায় সব ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে ধূমপানের কারনে আরো খারাপ অবস্থা তৈরি হয়।”

“ক্যান্সার, হৃদরোগ ও শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত রোগ ছাড়াও অন্ধত্ব, বধিরতা, ডায়বেটিস, স্মৃতিভ্রম এবং বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে ধূমপান। এছাড়া অপারেশন হওয়ার পর ধূমপায়ীরা সেরে উঠতে অধূমপায়ীদের চেয়ে বেশি সময় নেয়। অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের অপারেশন সফল না হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।”

আরো পড়ুনঃ ক্যান্সারের চিকিৎসা, মলদ্বারে ক্যান্সারের লক্ষণ, ঘরোয়া পদ্ধতিতে ডায়াবেটিস কমানোর উপায়

ধুমপানের অপকারিতা

1.ধূমপানের ফলে শরীরে তাপ বৃদ্ধি,প্রদাহ,জ্বালাপোড়া ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদি রোগ -ব্যাধি দেখা যায়।

2.ধূমপানের কারনে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস বা মস্তিষ্ক এবং মেরুদন্ডের সমস্যা দেখা দেয়।

3.ক্রনিক বাইনিটিস বা দীর্ঘমেয়াদী নাকের ইনফেকশন হয়।

4.উচ্চরক্ত চাপের কারন হয়ে দাড়ায়।

5.অতিরিক্ত ধূমপানের ফলে বয়সে তুলনায় বেশি বয়স্ক দেখায়।

6.ধূমপানের কারনে ফুসফুস, মূত্রথলি,কিডনি, কন্ঠনালীতে ক্যান্সার হয়ে থাকে।

7.হার্টের সাথে সম্পৃক্ত ধমনিগুলো ব্লক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

8.অতিরিক্ত ধুমপানের ফলে দৃষ্টিশক্তি লোপ পায়।

9.যকৃত শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

10.গর্ভপাত কিংবা অপরিনত শিশু জন্মাতে পারে।

11.ধূমপানকারী ব্যক্তি দেশ ও সমাজের কাছে একজন ঘৃণিত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

12.ধূমপানের ফলে যৌনশক্তি বিলুপ্ত হতে থাকে।

13.৯৫ শতাংশ শিশুর শরীরের নিকোটিন পাওয়া যায়।

14.ইদ্রিয় ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ঘ্রাণ নেওয়া এবং স্বাদ গ্রহনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

15.ধূমপায়ী ব্যক্তি সবসময় দুর্বলতা অনুভব করে।

16. হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

17.স্মরণশক্তি কমিয়ে দেয় এবং মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে।

See also  সুন্দর প্রোফাইল পিক ডাউনলোড | নিউ প্রোফাইল পিক | ফেসবুক প্রোফাইল পিক

18.মুত্রথলি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয় এবং প্রস্রাব বিষাক্ত হয়ে যায়।

19.ধূমপায়ীরা অধুমপায়ীদের থেকে ৫-৭ বছর কম বাঁচে।

20.ধূমপান মানুষের অপমৃত্যু ঘটায়।

21.ধূমপানের কারনে রিউমাটরেড় আথ্রাইটিসের

ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

22.ধূমপানের প্রভাবে চুল পড়া শুরু হয়।

23.বিষ খেলে যেমন মানুষের মৃত্যু হয়, তেমনি নিকোটিন গ্রহণ করলেও মানুষ মারা যায়।

24.ধূমপায়ী মহিলাদের মেনোপজ সময়ের অন্তত দুই বছর আগে হয়।

ধুমপান কি হারাম?

পিসটিভি বাংলার নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রশ্নো্ত্তর পর্বে ড. জাকির নায়েকের কাছে এক ব্যক্তি জানতে চান- ধূমপান করা হারাম কি না। এ বিষয়ে ডা। জাকির নায়েকের বক্তব্য হুবুহু তুলে ধরা হলোঃ

‘ধূমপানের কথা যদি বলতে হয়,অনেক বছর আগে যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নত হয়নি বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ সে সময় বলতেন যে ধূমপান মাকরূহ। একটা হাদীসের উপর ভিত্তি করে বলা যেটা আছে সহীহ বুখারীতে (খণ্ড নং-১,অধ্যায়-আযান,হাদীস নং-৮৫৫) নবীজী (ﷺ) বলেছেন,“কখনোও কেউ যদি কাঁচা রসুন বা পেঁয়াজ খায় সে আমার কাছ থেকে,মসজিদ থেকে দূরে থাকবে।”

নবীজী (ﷺ) বলেছেন, পেঁয়াজ বা রসুন খাওয়ার পরে মসজিদে এসো না কারণ বাজে গন্ধ বের হয়। আর ধূমপান করলে তো আরও বাজে গন্ধ বের হয়। পেঁয়াজ, রসুনের চেয়ে বেশি গন্ধ। এ হাদীসের উপর ভিত্তি করে যেহেতু পেঁয়াজ বা রসুন খাওয়া মাকরূহ, এই হাদীসের উপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞগণ ফতোয়া দিলেন ধূমপান করা মাকরূহ।

কিন্তু এখন বিজ্ঞান অনেক উন্নত হয়েছে। আমরা এখন জানতে পেরেছি যে ধূমপান জিনিসটা আসলে এক ধরনের ধীর গতির বিষক্রিয়া। তামাক আপনি যেভাবে নেন না কেন ধূমপানের মাধ্যমে,সিগারেট অথবা বিড়ি বা হুক্কা খেলেন কিংবা তামাক চিবোলেন এই তামাকের মধ্যে রয়েছে বিষক্রিয়া। এখন আমরা জানি যে এটা ধীর গতির বিষক্রিয়া।

আর এ কারণে বর্তমান পৃথিবীর বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ তারা বলেন ধূমপান করা হারাম। শুধু মুসলিম বিশেষজ্ঞ না অমুসলিমরাও বলেন আর সেজন্যই সংবিধি বদ্ধ সতর্কীকরণ থাকে। সিগারেটের প্যাকেটে একটা সতর্কীকরণ দেয়া থাকে যে “ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর”।

আবার অনেক দেশে লেখা থাকে যে ডাক্তারের সতর্কবাণী অথবা সার্জেনের সতর্কবাণী “ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর”। আর সিগারেটের বিজ্ঞাপন খবরের কাগজে বা কোন ম্যাগাজিনে থাকুক,বাধ্যতামূলক ভাবে এই সতর্কবাণীটা দিতে হবে “ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর”।

শুধুমাত্র মুসলিমরা নয় অমুসলিমরাও এ ব্যাপারে একমত যে ধূমপান এক ধরনের ধীর গতির বিষক্রিয়া। আর বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে বলছে প্রতি বছর ৪০ লাক্ষের ও বেশি মানুষ মারা যায় শুধু ধূমপানের কারণে। সব ধরনের তামাক সেবন করলে সংখ্যাটা আরো বেশি হবে।

এছাড়া আরো একটা পরিসংখ্যান বলছে,আমি এ ব্যাপারটা জেনেছি যখন আমি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ছিলাম যে ফুসফুসে ক্যান্সারে যারা মারা যায় তাদের ৯০ ভাগেরও বেশি মৃত্যুর কারণ ধূমপান;সিগারেট,বিড়ি বা এরকম কিছু। লংকায় যারা মারা যায় তাদের ৭০ থেকে ৭৫ ভাগের ক্ষেত্রে একমাত্র কারণ ধূমপান। ধূমপান আসলে একটা ধীর গতির বিষ।

এতে ঠোঁঠ কালো হয়ে যায়,হাতের নখ কালো হয়ে যায়,ঠোঁটের ক্ষতি হবে,হাতের আঙ্গুলের ক্ষতি হবে,ক্ষতিগ্রস্থ হবে পাকস্থলী,এতে করে দেখা যাবে কষ্টকাঠিন্য,খাওয়া দাওয়া অনিহা আসে,এতে যৌন ক্ষমতা কমে যেতে পারে,দেখা গেল হয়তো ঔষুধ ঠিক মত কাজ করছে না,এছাড়াও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

এটার উপরে একটা লেকচার দেয়া যায় যে ধূমপান কেন হারাম। আমার একটা লেকচারে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। এখানে বলার সময় নেই। তবে বিভিন্ন রিসার্চ এর উপর নির্ভর করে চারশো‘র ও বেশি এ বিষয়ে ফতোয়া দিয়েছেন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞগণ,তারা বলেছেন যে ধূমপান করা হারাম। তামাক সেবন করাটাই হারাম। কিছু কিছু দেশে যেমন-পাকিস্তান,বাংলাদেশ বা আমাদের ভারতের বিশেষজ্ঞগণ বলেন এটা মাকরূহ কিন্তু পুরো পৃথিবীতে বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞই বলেন ধূমপান “হারাম”।

আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,(সূরা-আরাফ,অধ্যায়-৭,আয়াত-১৫৭)“যারা আনুগত্য অবলম্বন করে রসূলের,যিনি উম্মী নবী,যাঁর সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জিলে লেখা দেখতে পায়,তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন সৎকর্মের,বারণ করেন অসৎকর্ম থেকে;পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষনা করেন ও অপবিত্র জিনিসকে হারাম করে যা তোমাদের জন্য খারাপ তা নিষিদ্ধ করে।…………..”

তাহলে নবীজী (ﷺ) যা দিয়েছেন তিনি যেগুলোকে ভালো বলেছেন সেগুলোকে আমরা গ্রহণ করবো,আর যেগুলো খারাপ সেগুলো থেকে বিরত থাকবো। এটাই হচ্ছে আইন। আর আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন,(সূরা-বাকারা,অধ্যায়-২,আয়াত-১৯৫)“তোমরা নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।”

See also  ভালোবাসার গল্প | Lovely Story

তার মানে নিজেকে মেরে ফেলো না। যেহেতু ধূমপান এক ধরনের ধীর গতি সম্পন্ন বিষক্রিয়া,তাই এটা আত্মহত্যা করার মত। বিষক্রিয়া,প্রত্যেক দিন আপনার ক্ষতি হবেই। এর উপর ভিত্তি করে চারশো’র ও বেশি ফতোয়া দেওয়া হয়েছে যে ধূমপান করা হারাম। আর এছাড়াও আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন- (সূরা-আরাফ,অধ্যায়-৭,আয়াত-৩১) “পানাহার করো কিন্তু অপচয় করবে না”

পবিত্র কুরআনে (সূরা-আল ইসরা,অধ্যায়-১৭,আয়াত- ২৬ ও ২৭) “যে তোমরা অপচয় করো না,বাজে খরচ করো না,যারা অপচয় করে তারা তো শয়তানের ভাই”

আমরা সবাই জানি ধূমপান করা আসলে অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে টাকার একটা নোট নিয়ে অথবা সবুজ রং এর ডলার বা পাউন্ড নিয়ে তারপর সেটাতে আগুন ধরিয়ে দিলেন। যখন ধূমপান করেন তখন সিগারেটে আগুন ধরান এটা আসলে টাকা পুড়িয়ে ফেলা,হোক সেটা রুপি বা টাকা বা ডলার বা পাউন্ড অথবা রিয়াল;এটা অপচয় ছাড়া কিছুই না, আর ইসলামে হারাম।

আর আমি কারণও দেখাতে পারি কেন এটা হারাম। যখন ধূমপান করেন তখন তাতে পাশের লোকের আরো বেশি ক্ষতিও হয়,অন্যের ক্ষতি তো হতে পারে। আর ধূমপান করলে যখন ধোঁয়াটা বাইরে ছাড়েন তাতে পাশের লোকের বেশি ক্ষতি হয়।

যে ধূমপান করে তার চেয়ে যে করে না তার বেশি ক্ষতি হয়। যদি কেউ সিগারেট খেয়ে ধোঁয়া ছাড়ে তার পাশে যে থাকে তার শরীরেও ধোঁয়া চলে যায় এতে করে ধূমপায়ীর চেয়ে পাশের লোকের বেশি ক্ষতি হয়। সেজন্য সিঙ্গাপুরে বাইরে ধূমপান করা নিষিদ্ধ,নিজে একাকী খেতে পারে কিন্তু বাইরে জনসাধারনের সামনে খাওয়া নিষিদ্ধ। তাহলে ধূমপান করা ক্ষতি কর সেজন্য এটা হারাম।

ধুমপান ছাড়ার উপায়

ধূমপান ছাড়ার জন্য আপনার ইচ্ছা যথেষ্ট

মো: আমানুল্লাহ পেশায় একজন প্রকৌশলী।

এক সময় প্রতিদিন তার ১০টি সিগারেট লাগতো ধূমপানের জন্য।

বছর তিনেক হলো মি: আমানুল্লাহ ধূমপান ছেড়েছেন।

কিভাবে ধূমপান ছাড়লেন তিনি?

মি: আমানুল্লাহ বলেন, “কোন উপায় নেই। একদিন হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলাম সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেব। এটা জাস্ট একটা ডিসিশন। অন্য কিছু না।”

ধূমপান ছেড়ে দেবার পর প্রথম তিন-চার মাস সেটি ধরে রাখতে বেশ কষ্ট হয়েছে তাঁর। এরপর থেকে আর কখনও ধূমপান করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না মি: আমানুল্লাহ।

ধূমপান করা এবং না করার মধ্যে শারীরিকভাবে বিরাট পার্থক্য আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

“পার্থক্য অনেক। এখন ঘুম ভালো হয়। যখন ধূমপান করতাম তখন অনেক সময় ক্ষুধা লাগলেও খেতে ইচ্ছা করতো না। কিন্তু এখন সে ধরনের সমস্যা নেই,” বলছিলেন মি: আমানুল্লাহ।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একবার কৌতূহল বশত একটি সিগারেট পান করেছে তাদের অনেকেই পরবর্তীতে পুরাদস্তুর ধূমপায়ী হয়ে গেছেন।

তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের কারণে প্রতি বছর ৬০ লাখ মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ধূমপানের বিষয়টি সবচেয়ে সামনে আসে।

বাংলাদেশের একজন সুপরিচিত চিকিৎসক অরূপ রতন চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরেই তামাকজাত পণ্যে ব্যবহারের বিপক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মি: চৌধুরীর মতে ধূমপান একটি আসক্তির মতো। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে নিম্নোক্ত পন্থাগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।

1. আজ এখুনি ধূমপান ছাড়ার প্রতিজ্ঞা করুন। টেবিল কিংবা পকেটে রাখা সিগারেটের প্যাকেট ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলুন

2. একদিন ধূমপান না করে দেখুন। এরপর পার্থক্য অনুভব করার চেষ্টা করুন। এরপর দুইদিন , তিনদিন ধূমপান থেকে দূরে থাকুন। তাহলে অভ্যাস গড়ে উঠবে।

3. আপনার আশপাশে যারা ধূমপান বর্জন করেছে তাদের অনুসরণ করুন। তাদের স্বাস্থ্যগত কী পরিবর্তন এসেছে সেটি জানার চেষ্টা করুন।

4. একটা হিসেবে করে দেখুন তো সিগারেট কিংবা তামাকজাত পণ্যের জন্য প্রতিমাসে আপনার কত টাকা খরচ হয়? হিসেব করে দেখলে ধূমপান ছাড়া আপনার জন্য সহজ হবে। সে টাকা জমিয়ে অন্য খাতে খরচ করতে পারেন।

5. আপনার ধূমপায়ী বন্ধুদের সঙ্গ সুকৌশলে এড়িয়ে চলুন।

6. সিগারেট ছাড়ার পর মুখে চুইংগাম কিংবা আদা চিবোতে পারেন। তাহলে ধূমপানের প্রতি আকর্ষণ কমে আসবে।

7. যে সময়টিতে আপনার ধূমপান করতে ইচ্ছা করবে সে সময়ে রাস্তায় হাঁটুন। তাহলে ধূমপানের চাহিদা থাকবে না।

8. যে কোন জায়গায় ধূমপান কর্নার থেকে দূরে থাকুন

9. ধূমপান বিরোধী এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার বই পড়তে পারেন

10. নিরুপায় হলে সর্বশেষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে কাউন্সেলিং-এর সহায়তা নিতে পারেন।

ধূমপান ছাড়ার জন্য কোন প্রস্তুতির দরকার নেই। আপনার একটি সিদ্ধান্তই যথেষ্ট।

3.3/5 - (90 Reviews)
foodrfitness
foodrfitness
Articles: 234