মধু খাওয়ার নিয়মঃ জেনে নিন কোন রোগে কিভাবে খাবেন

স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং যাবতীয় রোগ নিরাময়ে মধুর গুণ অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ (সা.) একে মহৌষধ বলেছেন। আয়ুর্বেদ এবং ইউনানি চিকিৎসা শাস্ত্রেও মধুকে বলা হয় মহৌষধ। এটা যেমন বলকারক, সুস্বাদু ও উত্তম উপাদেয় খাদ্যনির্যাস, তেমনি নিরাময়ের ব্যবস্থাপত্রও। আর তাই তো খাদ্য ও ওষুধ এ উভয়বিধ পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ নির্যাসকে প্রাচীনকাল থেকেই পারিবারিকভাবে ‘পুষ্টিকর ও শক্তিবর্ধক’ পানীয় হিসেবে সব দেশের সব পর্যায়ের মানুষ অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে ব্যবহার করে আসছে।

আমাদের আজকের প্রতিবেদন আপনি জানতে পারবেন সম্পর্কে মধু খাওয়ার নিয়ম এবং মধুর উপাদানসমূহ ও মধুর উপকারিতা সম্পর্কে।

মধুর উপাদানসমূহ

মধুতে প্রায়ই ৪৫ বা পঁয়তাল্লিশটি খাদ্য উপাদান আছে। ফুলে পরাগে মধু বা honey থাকে ২৪ থেকে ৩৮ শতাংশ  গ্লুকোজ , ৩৪ থেকে ৪৪ শতাংশ ফ্রুকটোজ, ০.৫ থেকে ৩.০ শতাংশ সুক্রোজ, ৫ থেকে ১২ শতাংশ মলটোজ, ২২ শতাংশ অ্যামাইনো অ্যাসিড, ২৮ শতাংশ খনিজ লবণ এবং ১১ শতাংশ এনকাইম। মধুতে কোনো চর্বি ও প্রোটিন নেই। ১০০ গ্রাম মধুর মধ্যে থাকে ২৮৮ ক্যালরি। 

মধু খাওয়ার নিয়ম

মধু খেতে অনেক মিষ্টি। কিন্তু খেলেই হবে না,মধু খাওয়ার নিয়মও জানতে হবে। তাহলে জানা যাক, মধু খাওয়ার নিয়ম গুলো–

১. মধুর তাপমাএা ৪২° সেন্টিগ্রেডের উপরে হলে মধুর গুণ পরিবর্তন বা change হয়ে বিষাক্ত হয়ে যায়। তাই আপনি যখন গরম পানির সাথে মধু মেশাবেন বা চায়ের চিনির বিকল্প হিসেবে মধু ব্যবহার করলে, তখন খেয়াল রাখতে হবে তা যেন অতিরিক্ত গরম না হয়।

২. পানি বা চা হালকা ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন অর্থাৎ গরম পানি বা চা এর তাপমাত্রা ৪২° ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে থাকতে হবে। তাপমাএা ৪২° নিচে থাকলে চা বা পানি সাথে মধু মিশিয়ে পান করুন।

৩. কেউ কেউ ঘুম থেকে উঠেই গরম পানির সাথে মধু মিশিয়ে পান করেন, যা শরীর সুস্থ-সবল রাখে এবং শরীর থেকে toxins বের করে দিতে সাহায্য করে। কিন্তু হালকা গরম পানির সাথে মধু মিশিয়ে পান করা উচিত।

৪. যাদের বেশি ওজন তারা হালকা গরম পানি সাথে লেবুর রস সঙ্গে মধু মিশিয়ে পান করবেন। ফলে প্রতিনিয়ত সকালে মিশ্রিত পানীয় পান করলে শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয়। দীর্ঘ মেয়াদী ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

৫. মধুতে থাকা উপাদান গরম কোনো কিছুর সংস্পর্শে বিষাক্ত হয়ে যায়। মধু কখনোই গরম করা বা রান্নায় ব্যবহার করা উচিত নয়। মধু ঠান্ডা খাওয়াই ভালো। বাজার থেকে কিনে আনা মধু এমনি প্রক্রিয়াজাত করার সময় তাপের সংস্পর্শে আসে। বেশিরভাগই ক্ষেত্রে মধু প্লাস্টিকের কৌটায় বিক্রি হয়। ফলে মধুর গুণাগুণ এমনিতেই কমে যায়। তার ওপর কোনো কিছুতে গরম করে মিশিয়ে পান করলে কার্যকারিতা একেবারেই কমে যায়।

মধু খাওয়ার নিয়ম
মধুর উপকারিতা

মধু খাওয়ার উপকারিতা

১। রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়ায়–  প্রথমেই যে কথাটি বলার তা হল মধু শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ায়। শরীরের ভেতরে বাইরে কোনো রকম ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে প্রতিরোধ করে। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান প্রতিরোধকারী শক্তি গড়ে তোলে, যে কোনো রকম সংক্রমণ থেকে দেহকে রক্ষা করে।

২। ওজন কমাতে– নিয়মিত মধু খেলে পাকস্থলীতে বাড়তি গ্লুকোজ তৈরি হয়। এই গ্লুকোজ মস্তিষ্কের সুগার লেভেল বাড়িয়ে দেয়। তার ফলে মেদ কমানোর হরমোন নিঃসরণের জন্য বেশি মাত্রায় চাপ সৃষ্টি করে। ফলে মেদ কমে যায়।

আরো পড়ুনঃ ওজন কমাতে দই ও তিসি বীজ এইভাবে খান, 15 দিনে ওজন কমানোর ডায়েট প্ল্যান

৩। অনিদ্রায়– অনিদ্রার জন্য খুব ভালো ওষুধ হল মধু। রাতে নিয়ম করে মধু খেলে গভীর ঘুম হয়।

৪। কোষ্ঠকাঠিন্য– মধুতে রয়েছে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স। এই ভিটামিন বি কমপ্লেক্স কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

৫। ডায়রিয়া– মধু ডায়রিয়া প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। তাই যাঁদের আমাশা, ডায়রিয়া বা পেট খারাপের প্রবণতা আছে তাঁরা নিয়মিত মধু সেবন করতে পারেন।

৬। অম্বলের সমস্যা– খাঁটি মধু যদি ভোরবেলা খাওয়া যায় তা হলে অম্বলের সমস্যা, মুখে টক ভাব দূর করে।

৭। হজমের সমস্যা– মধুর মধ্যে থাকা উপাদানগুলি হজম শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে খাবার খাওয়ার পর বদ হজম, গলা বুক জ্বালা ইত্যাদি সমস্যা দূর হয়।  

৮। পাকস্থলীর সুস্থতায়– মধু খেলে পাকস্থলীর কাজ জোরালো হয়। কারণ এটি হজমে সাহায্য করে। এর ব্যবহার হাইড্রোক্রলিক অ্যসিড ক্ষরণ কমিয়ে দেয়। তার ফলে পাকস্থলীর কাজ ভালো হয়।

৯। অরুচি– অনেকেই বেশি খেতে পারেন না। একটু খেয়েই হাঁপিয়ে ওঠেন। বা খাবারে ইচ্ছাটাই থাকে না। অরুচিতে ভোগেন। সে ক্ষেত্রে মধু খেলে খাবরে অরুচি কমে। খাবার চাহিদা বাড়ে।

১০। বমিভাব– অনেকেই আছেন খাবার দেখলেই বা সামান্য খেলেই বমি বমি ভাব আসে। সেই সমস্যার সমাধানও করে মধু। বমিভাব কনায় মধু।

১১। বুদ্ধি বাড়ে– মধু যে শুধু আপনার কায়িক শক্তি বাড়ায়, তা নয়। ঘুমানোর আগে এক চামচ মধু খেলে তা মস্তিষ্কের কাজ সঠিক ভাবে চালাতে সাহায্য করে। তার ফলে মস্তিষ্কের কার্য ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তথা বুদ্ধির জোর বাড়ে।

১২। হৃদরোগে– এটা হৃদপেশিকে সুস্থ সবল করে এবং এর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফলে আয়ু বৃদ্ধি পায়।

আরো পড়ুনঃ হৃদরোগের লক্ষণ, হৃদরোগ থেকে মুক্তির উপায় ও প্রতিরোধে করণীয়

১৩। রক্ত ও রক্তনালী পরিষ্কার– মধু নিয়মিত খেলে রক্তনালীর বিভিন্ন সমস্যা দূর হয়। অর্থাৎ রক্তনালী পরিষ্কার থাকে। সেখানে দূষিত কোনো পদার্থ যা স্বাস্থ্য হানির কারণ তা জমতে পারে না। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়।

১৪। রক্ত উৎপাদনে– রক্ত উৎপাদনকারী উপকরণ হল আয়রন। আর এই আয়রন প্রচুর পরিমাণে রয়েছে মধুতে। ফলে শরীরে লোহিত রক্ত কণিকা, শ্বেত রক্ত কণিকা-সহ রক্তের ইত্যাদি উপাদানগুলি গড়ে তুলতে সাহায্য করে মধু।

১৫। কোলেস্টেরলের ক্ষেত্রে– মধু রক্তের খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ ১০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমার অর্থ হল হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা অনেকাংশে কমে যাওয়া।

১৬। শরীরের নানান ব্যথায়– আজকাল বেশি ভাগ মানুষেরই শরীরের বিভিন্ন জায়ফগায় ব্যথা। ছোটো বড়ো সকলেরই গাঁটে বা জয়েন্টে ব্যথায় কষ্ট পাওয়ার একটি সমস্যা তো লেগেই থাকে। এই সমস্যার কারণ হল শরীরের অবাঞ্ছিত রস। এই রসের কারণে বাতের ব্যথা তৈরি হয়। সেই খারাপ রস অপসারিত করতে মধু বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

১৭। পেশিশক্তি বাড়াতে– পেশিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে মধু। এতে আছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক চিনি। এই প্রাকৃতিক চিনি শরীরে শক্তি যোগায়। পেশিকে অনেক বেশি কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করে।

১৮। দুর্বলতা দূর করতে– অনেকেই সারাক্ষণ ঝিমুনি বা দুর্বল অনুভব করেন। এই ঝিমুনি, ঘুম ঘুম বা দুর্বল ভাব কাটানোর জন্য ও সারাক্ষণ তরতাজা থাকতে নিয়মিত খেতে পারা যায় মধু।

১৯। যৌন দুর্বলতায়– অনেক পুরুষের একটা সমস্যা থাকে, তা হল যৌন দুর্বলতার সমস্যা। এই সমস্যা নানান রকমের হয়। এই সমস্যার একটিও যদি কোনো পুরুষের থাকে তবে তিনি নিয়মিত মধু খাওয়া শুরু করতে পারেন। তাতে এই সমস্যা থেকে রেহাই মিলবে।

আরো পড়ুনঃ অশ্বগন্ধার উপকারিতা ও অপকারিতা এবং খাওয়ার নিয়ম, ভাজা তেঁতুল বীজের উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম

২০। হাঁপানি– মধুর নানান গুণাগুণগুলির মধ্যে একটি হল এটি হাঁপানি রোগ কমাতে সাহায্য করে। তাই এই রোগ থাকলে তা কমাতে হলে খাওয়া যেতে পারে মধু।

২১। গ্যাসট্রিক আলসারে– যাঁরা গ্যাসট্রিক আলসারের সমস্যায় রয়েছে তাঁরা নিয়মিত মধু খেলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

২২। হাড় ও দাঁতের গঠনে– মধুর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ক্যালসিয়াম। এই ক্যালসিয়াম দাঁত, হাড়, চুলের গোড়া শক্ত রাখে, নখের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করে, ভেঙে যাওয়া রোধ করে।

২৩। দাঁতের যত্নে– মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য রক্ষায় মধু ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ এটি দাঁতের জন্য খুবই ভালো। দাঁতের ক্ষয়রোধ করতে পারে মধু। অনেক সময়ই দাঁতে স্টোন হয় অর্থাৎ যাকে দাঁতে পাথর জমা বলে, সেই দাঁতে পাথর জমাট বাঁধা রোধ করে মধু। তা ছাড়াও দাঁত পড়ে যাওয়া আটকাতে বা তা বিলম্বিত করতে সাহায্য করে মধু। সঙ্গে দাঁতের মাড়ির স্বাস্থ্য রক্ষা করে।

সর্তকতাঃ

মধুর আমাদের শরীরকে খুব তাড়াতাড়ি গরম করতে সাহায্য করে থাকে।আমরা অনেকেই একসাথে অনেকটা মধু খেয়ে ফেলি ফলে শরীর খুব বেশি গরম হয়ে পরে ইহার ফলে অনেক খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে তাই সবকিছুই পরিমাণ মতো খাওয়া উচিত।

আরো পড়ুনঃ

5/5 - (6 Reviews)

Leave a Reply

Your email address will not be published.