হলুদের উপকারিতা ও ঔষধি গুণ

হাজার বছর ধরে রান্নার কাজে ব্যবহৃত মসলার মধ্যে লবণ মরিচের পরেই হলুদের স্থান। যেকোনো রান্নার কাজে হলুদের ব্যবহার অপরিহার্য। হলুদ কিন্তু শুধু খাাবারে রং এর জন্যই ব্যবহৃত হয় না। হলুদ ব্যবহারে রয়েছে নানাবিধ উপকারিতা। খাবার এর সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে সাথে খাবার এর স্থায়িত্বও বৃদ্ধি করে।

মসলাজাতীয় ফসলের তালিকায় শীর্ষ ব্যবহারযোগ্য ফসলের মধ্যে হলুদ অন্যতম। কাঁচা হলুদ থেকে শুরু করে গুঁড়া হলুদের ব্যবহার ব্যাপক। নিত্য খাবার ব্যঞ্জনের রঙ করার উদ্দেশ্যেই প্রধানত এর ব্যবহার করে থাকে অনেকেই। কিন্তু জানেনা এর অজস্র উপকারিতা। শারীরিক প্রয়োজনেও হলুদের ব্যবহার হয়ে থাকে। শুধু হলুদ দিয়েই রোগ নিরাময়ে বহুমাত্রিক ব্যবহার সম্ভব।

হলুদের মধ্যে রয়েছে কারকিউমিন নামক একটি উপাদান, যা একাই একশোর বেশি রোগ সারাতে পারে। হাজারেরও বেশি বছর ধরে এশিয়ায় হলুদের ব্যবহার শুধু মসলা হিসাবে নয়, ঔষধ হিসাবেও। ভিটামিন ই বা ভিটামিন সি-র তুলনায় পাঁচ থেকে আট গুণ বেশি কার্যকরী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট কারকিউমিনে বিদ্যমান যা শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। আর্থ্রাইটিস, অ্যাজমা, হার্টের রোগ, অ্যালঝাইমার, ডায়াবেটিস এমনকী ক্যান্সার প্রতিরোধেও কারকিউমিনের উপকারী গুণ অপরিহার্য বলে দাবি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের।

হলুদের পুষ্টিগুণ

প্রথমে হলুদের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নিই আমরা। আমেরিকার কৃষি বিভাগের জাতীয় পুষ্টিগুণ তথ্যপঞ্জি অনুযায়ী, ১ টেবিল চামচ হলুদ গুঁড়ায় পাওয়া যায়।

  • ২৯ ক্যালরি
  • ০.৯১ গ্রাম প্রোটিন
  • ০.৩১ গ্রাম চর্বি
  • ৬.৩১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট
  • ২.১ গ্রাম আঁশ
  • ০.৩ গ্রাম গ্লুকোজ
  • ২৬% ম্যাংগানিজ
  • ১৬% আয়রন
  • ৫% পটাশিয়াম
  • ৩% ভিটামিন সি
  • সামান্য পরিমাণ ভিটামিন ই, ভিটামিন কে, ক্যালসিয়াম, কপার ও জিংক।

কাঁচা হলুদের ঔষধি গুণ

ডায়াবেটিসঃ হলুদে থাকা কারকিউমিন অ্যান্টি-ডায়াবেটিক এজেন্ট হিসেবে কাজ করে ও রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া কাঁচা হলুদ ইনসুলিন হরমোনের ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে ও অগ্ন্যাশয়কে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

খাদ্য পরিপাকঃ কাঁচা হলুদের মধ্যে গ্যাস্ট্রো-প্রটেক্টিভ কিছু গুণ থাকে যা খাবার পরিপাকে সাহায্য করে। ফলে হজমের গোলমাল, গ্যাসের সমস্যার ক্ষেত্রে কাঁচা হলুদ খুবই উপকার দেয়।

খাদ্য সংক্রমণ থেকে বাঁচতেঃ হলুদে থাকা কারকিউমিনের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ও অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট উপাদান থাকায় তা বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে খাদ্যনালীকে বাঁচায়। আমরা রোজ যে খাবার খাই, তার মধ্যে অনেকসময়ই নানা জীবাণু থেকে যায়। খাবারে কাঁচা হলুদ বা হলুদ গুঁড়ো ব্যবহার করলে তা খাদ্যনালীকে ক্ষতিকর জীবাণুর সংক্রমণ থেকে বাঁচায়। খাদ্যনালীর প্রদাহের সম্ভাবনা কমায়।

হাড় জোড়া লাগাতেঃ বহু প্রাচীনকাল থেকেই কাঁচা হলুদকে হাড়ের নানারকম রোগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। হাত বা পা মচকে গেলে চুন-হলুদ লাগানোর কথা তো আমরা সবাইই জানি। এছাড়া কাঁচা হলুদ বেটে ভাঙ্গা হাড়ের জায়গায় লাগালে তা উপকার দেয়। দুধে কাঁচা হলুদ দিয়ে খেলেও তা এক্ষেত্রে উপকার দেয়। হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ ব্যথা, প্রদাহ কমায় এবং হাড়ের টিস্যুগুলি রক্ষা করে ও ভাঙ্গা হাড় জোড়া লাগতে সাহায্য করে।

হাড়ের ক্ষয় রোধেঃ কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিন হাড়ের ক্ষয় ও হাড়ের গঠনের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখে ও হাড়কে সুস্থ ও মজবুত রাখে। মেনোপজের সময় মহিলাদের যে হাড়ের ক্ষয় হয়, তা থেকেও বাঁচতে কাঁচা হলুদ আমাদের সাহায্য করে।

মনমরা ভাব কাটাতেঃ কাঁচা হলুদের অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট গুণ আমাদের বিষণ্ণ মনমরা ভাব, বদমেজাজ, ডিপ্রেশন কাটিয়ে মনকে চনমনে করে তুলতে সাহায্য করে।

স্ট্রোকের পরেঃ নিয়ম করে কাঁচা হলুদ খাওয়া আমাদের স্ট্রোকের সম্ভাবনাকে এক ধাক্কায় অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া কাঁচা হলুদের অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ স্ট্রোকের পরবর্তী চিকিৎসাতেও অনেক উপকার দেয়। কাঁচা হলুদ হার্টকেও বিভিন্ন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। এছাড়া অপারেশনের পরে যে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা থাকে, তাকেও কাঁচা হলুদ কমাতে সাহায্য করে।

দাঁতের ক্ষয় রোধ করতেঃ কাঁচা হলুদ দাঁতের ওপরে থাকা এনামেলের আস্তরণকে রক্ষা করে ও দাঁতের ক্ষয় থেকে দাঁতকে বাঁচায়। হলুদের অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণাবলী থাকায় তা জীবাণু থেকেও দাঁতকে রক্ষা করে। এছাড়া মাড়ি থেকে রক্ত পড়া কমাতে ও মুখের ভেতরে ক্ষত সারাতে কাঁচা হলুদ নিয়ম করে খাওয়া যায়।

ওজন কমাতেঃ কাঁচা হলুদের অ্যান্টি-ওবেসিটি প্রপার্টি থাকায় নিয়ম করে কাঁচা হলুদ খেলে তা শরীরে মেদ জমতে বাঁধা দেয়।

রান্নার তেলের অক্সিডেশন কমাতেঃ উঁচু তাপমাত্রায় রান্না করার ফলে রান্নার তেলের যে অক্সিডেশন বা জারণ প্রক্রিয়া শুরু হয় তার ফলে অনেক ক্ষতিকারক পদার্থ উৎপন্ন হয় যা ক্যান্সার ও ফাইব্রোসিস ডেকে আনতে পারে। তাই কাঁচা হলুদের পেস্ট করে বা হলুদ গুঁড়ো দিয়ে রান্নার জিনিস মেখে রাখার পর তারপর তা দিয়ে রান্না করলে তা রান্নার তেলের অক্সিডেশন কমায় ও আমাদের ক্যান্সারের সম্ভাবনাও কমায়।

তলপেটে ব্যথা কমাতেঃ কাঁচা হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ আমাদের তলপেটে ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।

সর্দিকাশিতেঃ হলুদে থাকা কারকিউমিন ইনফ্লুয়েঞ্জা, সর্দিকাশি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া কাঁচা হলুদ আমাদের শরীরের ইমিউনিটি বা অনাক্রম্যতা বাড়ায় ও সর্দিকাশি থেকে আরাম দেয়। কাঁচা হলুদে থাকা ভিটামিন সি-ও সর্দিকাশি কমাতে সাহায্য করে।

অ্যানিমিয়া কমাতেঃ কাঁচা হলুদের মধ্যে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট গুণ থাকায় তা অ্যানিমিয়ার হাত থেকে আমাদের বাঁচায়। মেয়েদের সাধারণত অ্যানিমিয়া হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তাই তাদের পক্ষে কাঁচা হলুদ নিয়ম করে খাওয়া খুবই উপকারী। এছাড়া হলুদে থাকা কারকিউমিন লোহিত রক্তকণিকাকে রক্ষা করে। হলুদে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকায় তা রক্তে আয়রনের ঘাটতিকেও মেটাতে সাহায্য করে।

অ্যালজাইমারেঃ অ্যালজাইমার সারা পৃথিবীতেই এখন মারাত্মক রোগের আকার ধারণ করেছে। হলুদে থাকা কারকিউমিন অ্যালজাইমারের চিকিৎসায় সাহায্য করে। হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট গুণ, স্মৃতিকে রক্ষা করার ক্ষমতা অ্যালজাইমারের চিকিৎসায় কাজে লাগে। দেখা গেছে নিয়ম করে কাঁচা হলুদ খেলে তা এই রোগের সম্ভাবনাকে অনেকটাই কমায়।

পিরিয়ডসের সময়ঃ পিরিয়ডসের আগে বা পিরিয়ডসের সময় পেটে ব্যথা যদি হয়, তাহলে নিয়ম করে কাঁচা হলুদ খান। কাঁচা হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ পেট ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া পলি-সিস্টিক ওভারি থাকলেও কাঁচা হলুদ নিয়ম করে খেলে উপকার পাওয়া যাবে।

বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচতেঃ বিভিন্ন পেইনকিলার খেলে যে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়, এছাড়া বিভিন্ন ওষুধের যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় তা থেকে আমাদের যকৃত, কিডনিকে কাঁচা হলুদ সুস্থ রাখে। এছাড়া কাঁচা হলুদ নিজেও অনেকসময় বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

অনিদ্রা দূর করতেঃ কাঁচা হলুদ মেশানো দুধ অ্যামাইনো অ্যাসিড ও ট্রিপটোফ্যান উৎপন্ন করে যা অনিদ্রা রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে এবং শান্তিপূর্ণ ঘুমে সাহায্য করে।

প্রজননেঃ কাঁচা হলুদে থাকা ইস্ট্রোজেন হরমোন মেয়েদের প্রজননে সাহায্য করে। এছাড়া হরমোনের সমস্যার জন্যে যদি প্রেগন্যান্সিতে সমস্যা হয়, তাহলে নিয়ম করে কাঁচা হলুদ দুধে মিশিয়ে খেলে উপকার চোখে পরবে।

রক্তচাপ কমাতেঃ কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিন আমাদের রক্তনালীকে উন্মুক্ত করে ও রক্ত চলাচলে বাধাকে দূর করে। ফলে রক্তচাপ কমায়।

মদ্যপান জনিত ক্ষতি থেকে বাঁচতেঃ নিয়মিত মদ্যপানের ফলে যে গ্যাস্ট্রিকের প্রদাহ, মস্তিস্ক ও ফ্যাটি লিভার ডিসিস হয়, তার থেকে বাঁচতে কাঁচা হলুদ আমাদের সাহায্য করে। দেখা গেছে প্রায় ৭৮.৯ শতাংশ ফ্যাটি লিভার ডিসিস নিয়ম করে কাঁচা হলুদ খাবার ফলে কমে যায়।

পেশীর টানেঃ হলুদে থাকা কারকিউমিনের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ বিভিন্ন পেশীর টানজনিত রোগ, যেমন আরথ্রাইটিস, অস্টিও-আরথ্রাইটিস, অষ্টিও-পোরোসিস প্রভৃতির প্রদাহ থেকে আমাদের মুক্তি দেয়। পেশীতন্তুর ক্ষয় থেকেও কাঁচা হলুদ আমাদের রক্ষা করে।

মস্তিস্কের বয়সজনিত সমস্যাতে ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতেঃ কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিন মস্তিস্কে রক্ত চলাচলকে স্বাভাবিক রাখে ও বয়সজনিত সমস্যা থেকে মস্তিষ্ককে বাঁচায়। এছাড়া ‘মুড’ ঠিক রাখতে ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও নিয়ম করে কাঁচা হলুদ খাওয়া আমাদের উপকার দেয়।

থাইরয়েডের হাত থেকে বাঁচতেঃ নিয়ম করে কাঁচা হলুদ খাওয়া আমাদের গলগণ্ডের সম্ভাবনাকে কমায়। এছাড়া থাইরয়েডের প্রদাহ থেকে বাঁচতে হলুদে থাকা কারকিউমিন আমাদের সাহায্য করে।

হাঁপানিতেঃ হলুদে থাকা কারকিউমিন শ্বাসনালীর পথে থাকা বাধাকে দূর করে ও শ্বাস নেবার ক্ষমতা বাড়ায়। ফলে হাঁপানি থাকলে নিয়ম করে কাঁচা হলুদ খেয়ে দেখুন, সহজে উপকার পাবেন।

ক্যান্সার দূর করতেঃ কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিন ক্যান্সার দূর করতে সহায়তা করে। কারকিউমিন ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি বন্ধ করে তাদের মৃত্যু ঘটায়। ফলে ক্যান্সারের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। বিভিন্ন স্টাডি থেকে জানা গেছে প্রায় ৫৬ রকম ক্যান্সারের সম্ভাবনা কাঁচা হলুদ রোজ নিয়মিত খেলে কমে।

ট্রমাটিক ডিসঅর্ডার কমাতেঃ ট্রমাটিক ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে যেসমস্ত খারাপ, ভীতিজনক স্মৃতি থাকে, হলুদে থাকা কারকিউমিন তা কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া কাঁচা হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ স্ট্রেস বা চাপ, উদ্বেগ থেকে আমাদের মুক্তি দেয়।

হেপাটাইটিসেঃ হেপাটাইটিসের ফলে আমাদের যকৃতের প্রদাহ হয়। কাঁচা হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ও অ্যান্টি-ভাইরাল গুণ হেপাটাইটিসের সময় যকৃতের প্রদাহ থেকে আমাদের বাঁচায়। এছাড়া হেপাটাইটিস ভাইরাসের থেকেও হলুদ আমাদের রক্ষা করে। কাঁচা হলুদ নিয়ম করে খেলে তা যকৃতকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে ও যকৃতের স্বাভাবিক কাজকে বজায় রাখতে সাহায্য করে।

মেনোপজের সময়েঃ হলুদ গাছকে ফাইটো-ইস্ট্রোজেন বা ইস্ট্রোজেন হরমোনের উদ্ভিজ্জ উৎস বলা হয়। ইস্ট্রোজেন মেয়েদের দেহে থাকা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। কাঁচা হলুদের ব্যথা কমানোর ক্ষমতা, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট গুণ ডিপ্রেশন কাটানোর ক্ষমতা মেনোপজের সময় নানাভাবে সাহায্য করে।

মস্তিস্কের বয়সজনিত সমস্যাতে ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতেঃ কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিন মস্তিস্কে রক্ত চলাচলকে স্বাভাবিক রাখে ও বয়সজনিত সমস্যা থেকে মস্তিষ্ককে বাঁচায়। এছাড়া ‘মুড’ ঠিক রাখতে ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও নিয়ম করে কাঁচা হলুদ খাওয়া আমাদের উপকার দেয়।

তামাকজাত ক্ষতি থেকে বাঁচতেঃ ধূমপানের ফলে তামাক ও নিকোটিন আমাদের ফুসফুসের ক্ষতি করে। কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিন ফুসফুসকে খানিকটা হলেও ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায় ও ফুসফুসের প্রদাহ হ্রাস করে।

আঘাত থেকে ডি.এন.এ. কে বাঁচাতেঃ কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিনের জিনকে রক্ষা করার কিছু ক্ষমতা আছে। ফলে তা আমাদের ডি.এন.এ.-কে বিভিন্নভাবে আঘাত থেকে রক্ষা করে। ক্যান্সারের ফলে যেসমস্ত কোষের ডি.এন.এ. ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের কাঁচা হলুদ কেমোথেরাপির উপাদানগুলির সাথে সংবেদনশীল করে তোলে। এছাড়া বিভিন্ন রিসার্চ থেকে জানা গেছে কাঁচা হলুদের পেস্ট বা এক্সট্র্যাক্ট কোষের ডি.এন.এ.-কে ৮০ শতাংশ রক্ষা করে।

চুলের জন্যঃ কাঁচা হলুদ খুশকির সমস্যা, চুল পড়ার সমস্যা, ইত্যাদির থেকেও আমাদের মুক্তি দেয়।

ত্বকের বয়স কমাতেঃ কাঁচা হলুদ বহু প্রাচীনকাল থেকেই ত্বকের ঔজ্জ্বল্য রক্ষা করতে ও ত্বকের বয়স কমায়। তাই বিভিন্ন ক্রিমের প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে হলুদ ব্যবহার করা হয়। ত্বকের বিভিন্ন দাগ, রিঙ্কল ও সান ট্যান থেকে ত্বককে রক্ষা করার জন্য কাঁচা হলুদের পেস্ট ঘরেই তৈরি করে মুখে লাগানো যেতে পারে। হলুদে থাকা কারকিউমিনের অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট গুণ ত্বককে বয়সের ছাপ থেকে বাঁচায়।

অগ্ন্যাশয়কে সুস্থ রাখতেঃ কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিন ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ অগ্ন্যাশয়কে সুস্থ রাখে ও প্রদাহের হাত থেকে অগ্ন্যাশয়কে রক্ষা করে।

রক্তকে পরিশুদ্ধ করেঃ কাঁচা হলুদ রক্তকে পরিশুদ্ধ রাখতে সাহায্য করে ও রক্তকে পরিষ্কার রাখে।

অ্যালার্জি রোধেঃ কাঁচা হলুদ অ্যান্টি অ্যালার্জিক হিসেবে কাজ করে।

বাচ্চাদের লিউকোমিয়ার সম্ভাবনা কমাতেঃ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফলে জানা গেছে কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিন ও অ্যান্টি এক্সিড্যান্ট গুণ বাচ্চাদের মধ্যে লিউকেমিয়ার সম্ভাবনাকে কমায়।

হলুদের ব্যবহার

ব্রণ নিরাময়েঃ সকালে খালি পেটে ২ টুকরো কাঁচা হলুদ ও ২টা নিমপাতা একসঙ্গে (আখের গুড়সহ) মিশিয়ে খেলে ব্রণ নিরাময় সম্ভব। দেহের উজ্জ্বলতাও বৃদ্ধি পাবে।

পেটের ক্রিমিনাশক হিসেবেঃ হলুদ ক্রিমিনাশকারী হিসেবেও পরিচিত।বয়সের তারতম্য অনুযায়ী ১৫-২০ ফোঁটা কাঁচা হলুদের রস ছেঁকে নিয়ে তাতে অল্প লবণ মিশিয়ে সকালে খালিপেটে ৭ দিন খেলে দেখা যাবে কার্যকরী ফল।

প্রমেহ রোগেঃ প্রস্রাবের জ্বালার সঙ্গে পুঁজের মতো লালা নির্গত হলে, কাঁচা হলুদের রস ১ চা-চামচ একটু মধু বা চিনি মিশিয়ে ২-৩ সপ্তাহ খেতে হবে। এমনকি এর দ্বারা অন্যান্য প্রকার প্রমেহ রোগেরও উপশম হয়ে থাকে।

চোখ উঠলেঃদ হলুদ থেঁতো পানিতে অর্থাৎ হলুদ গুঁড়া করে পানিতে ভিজিয়ে ছেঁকে নিয়ে ঐ রসে চোখ ধুতে হবে/ঐ রসে পরিষ্কার ন্যাকড়া ভিজিয়ে চোখ মুছতে হবে।এতে চোখের লালা কেটে চোখ তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে।

গলা বসে যাওয়াঃ কোনো সাধারণ কারণে গলা বসে স্বর রুদ্ধ হয়ে গেলে ২ গ্রাম পরিমাণ হলুদ গুঁড়ার শরবত চিনি মিশিয়ে একটু গরম করে ১ ঘণ্টা পরপর ৪-৫ বার খেলে চমৎকার উপকার হয়।

ফোঁড়া পাকাতে ও শুকাতেঃ হলুদ আগুনে পুড়িয়ে পোড়া ছাই সামান্য পানিতে গুলে ফোঁড়ায় লেপে দিতে হবে। এতে ফোঁড়া পেকে গিয়ে ফেটে যাবে। এরপর গুঁড়া হলুদ সামান্য পানিতে গুলে প্রলেপ দিলে ফোঁড়া শুকিয়ে যাবে। অথবা সামান্য হলুদের সঙ্গে সামান্য চুন মিশিয়ে গরম করে চিমটি পরিমাণ ফোঁড়ার মাথায় লাগালে ফোঁড়া ফেটে রক্ত ও পুঁজ বের হয়ে ব্যথা কমে যায়।

মচকে গেলেঃ দেহের কোনো অংশ মচকে গেলে ১ ভাগ লবণ, ২ ভাগ চুন ও ৪ ভাগ হলুদ বাটা একত্রে ভালো করে মিশিয়ে গরম করে চোটের জায়গায় ২-৩ দিন লাগাতে হবে।

লিভার বা যকৃতের দোষেঃ ১ চামচ কাঁচা হলুদের রস (শিশুদের জন্য ৫-৬ ফোঁটা) সামান্য চিনি অথবা মধুসহ খেতে হবে অন্তত ১ মাস।

গলা ধরে গেলেঃ চিৎকার, বক্তব্য বা গান যে কোনো কারণে গলা বসে গেলে ১ গ্লাস গরম পানিতে মাত্র ২ গ্রাম হলুদের গুঁড়া ও ২ চা-চামচ চিনি মিশিয়ে শরবত করে কয়েক বার খেতে হবে।

তোতলামিতেঃ ছোটবেলায় যাদের কথা আটকে যায়, অথবা তাড়াতাড়ি কথা বলার জন্য তোতলামি দেখা দিলে কাঁচা হলুদ ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে গুঁড়া করে ১ চামচ পরিমাণ নিয়ে ১ চামচ ঘিয়ে ভেজে সারা দিনে ২-৩ বার খেতে হবে।

খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়ঃ হলুদে উপস্থিত কারকিউমিন রক্তে জমতে থাকা এল ডি এল বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় যাতে স্বাভাবিকভাবেই হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের সম্ভাবনাও হ্রাস পায়।

জোঁক ধরলেঃ কখনো জোঁক ধরলে জোঁকের মুখে হলুদ গুঁড়া দিলে সঙ্গে সঙ্গে জোঁক পড়ে যাবে এবং রক্ত বন্ধ হবে।

শরীরের দাগ উঠাতেঃ গায়ে হাম বসন্ত বা চুলকানির দাগ থাকলে কাঁচা হলুদ ও নিমপাতা একত্রে বেটে কয়েক দিন লাগালে দাগ উঠে যাবে ও চামড়া ফর্সা হবে।

বাইরের আক্রমণ থেকে পচনশীল বস্তুকে রক্ষা করতেঃ মাছ, মাংস, শুঁটকি জাতীয় বস্তুকে প্রক্রিয়াজাত করার পূর্বে হলুদ ও লবণ মিশিয়ে নিলে টাটকা ও বিশুদ্ধ রাখা যায়। বিশেষ করে শুটকি বানানোর ক্ষেত্রে হলুদ ও লবণ মিশিয়ে রোদে শুকাতে দিলে তাতে মাছি ডিম পাড়েনা।

হলুদ খাওয়া নিয়ম

  • গুঁড়া হলুদ রান্নায় ব্যবহার করে
  • ক্যাপসুল আকারে
  • কাঁচা হলুদ টুকরা করে কেটে আখের গুড় দিয়ে মেখে খাওয়া যায়
  • রূপচর্চায় বাটা হলুদ ব্যবহার করা যায়
  • দুধ হলুদ খাওয়া যায়।
  • হলুদ চা

শুকনো হলুদের উপকারিতাঃ পুষ্টিগুণের দিক দিয়ে গুড়ো হলুদ বা শুকনো হলুদের চেয়ে কাঁচা হলুদের পুষ্টিগুণ বেশি। কিন্তু কাঁচা হলুদ সবসময় সহজলভ্য না হওয়ায় সেক্ষেত্রে শুকনো হলুদ বা গুড়ো হলুদ বেশি ব্যবহৃত হয়।

হলুদের সর্বোচ্চ উপকার পাওয়ার জন্য আপনি নিয়মিত হলুদ চাপান করতে পারেন।

হলুদ-দুধ

হলুদ দুধ আপনার হাড় শক্ত করবে। যেকোনো ধরনের ক্ষত দ্রুত সারিয়ে তুলবে। ভিতর থেকে ত্বককে করবে উজ্জ্বল।

হলুদ-দুধ রেসিপিঃ

উপকরণঃ

  • এক কাপ দুধ
  • চা চামচ হলুদ
  • একটি ছোট আদা গ্রেড করা / ১/২ চা চামচ আদার পাউডার।
  • ১/২ চা দারুচিনি পাউডার
  • সামান্য গোল মরিচ।
  • ১চা চামচ মধু

প্রস্তুত প্রণালিঃ একটি পাত্রে সব উপাদান মিশিয়ে বলক আসা পর্যন্ত জ্বাল দিতে হবে। গন্ধ ছড়ানো অব্দি অপেক্ষা করতে হবে হালকা জ্বালে। ছেঁকে উপরে দারুচিনি গুড়া ছিটিয়ে পরিবেশন করুন।

হলুদের অপকারিতা

কোনোকিছুই অতিরিক্ত ভালো না। সবকিছুরই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রয়েছে যা অতিক্রম করলে ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। হলুদ ব্যবহার এর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।বয়স অনুযায়ী নির্যাস হিসেবে দিনে ৫০০মি.লি গ্রাম থেকে ২০০০ মি.লি.গ্রাম পর্যন্ত হলুদ খাওয়া নিরাপদ।

হলুদ ব্যবহারে সাবধানতাঃ হলুদের এতো এতো গুণ আছে মানেই আপনি অতিরিক্ত হলুদ খাবেন তা কিন্তু হবেনা। অতিরিক্ত হলুদ গ্রহণে হতে পারা ক্ষতিকর দিকগুলো নিম্নরুপঃ

পেটের সমস্যাঃ হলুদের প্রভাব গরম।আপনি যদি বেশি পরিমাণে হলুদ খান তা আপনার পেটে জ্বালাভাব সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও ফোলাভাব এবং বাচ্চাদের ও সমস্যা দেখা দিতে পারে।তাই কেবলমাত্র সঠিক পরিমাণে হলুদ গ্রহণ করা উচিৎ।

কিডনিতে পাথরঃ হলুদের ভিতরে অক্সালেট উপস্থিত রয়েছে। এই অক্সালেট দেহে ক্যালসিয়াম দ্রবীভূত না করে বাঁধাই করে।যার কারণে কিডনিতে পাথর সৃষ্টি হতে পারে।

ডায়রিয়া/বমি বমি ভাবঃ অতিরিক্ত হলুদ গ্রহণে হজমে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।এর কারণে অনেক সময় ডায়রিয়া বা বমিভাবের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আয়রন শোষণে সমস্যাঃ দেহের প্রতিটি খনিজ পদার্থের নিজস্ব কাজ রয়েছে।এর মধ্যে একটি আয়রন। আয়রনের অভাবে অনেক সমস্যা দেখা দেয়। হলুদ অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে আয়রণ শোষণ হতে বাঁধা দিতে পারে। যদি আপনার শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকে তবে আপনার কেবলমাত্র নির্ধারিত পরিমাণে হলুদ গ্রহণ করা উচিৎ।নির্ধারিত পরিমাণের বেশি হলুদ গ্রহণ করলে আপনার ক্ষতির কারণ হবে।

ত্বকের সমস্যাঃ হলুদের বৈশিষ্ট্যগুলো ত্বক ও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হিসেবে বিবেচিত। আপনি যখন এটি প্রচুর পরিমাণে গ্রহণ করবেন তখন এগুলো বিপরীতে পরিণত হবে। ত্বক ফাটা হতে পারে, অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে।

শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যাঃ অতিরিক্ত হলুদ সেবনে শ্বাসকষ্ট ও দেখা দিতে পারে।

অবশ্যই মনে রাখবেন হলুদের উপকারিতা বা অপকারিতা নির্ভর করে কেবল তার পরিমাণের উপর। তাই নির্দিষ্ট পরিমাণে হলুূদ গ্রহণ করুন, অতিরিক্ত নয়।

আরো পড়ুনঃ

5/5 - (19 Reviews)

Leave a Reply

Your email address will not be published.