কারি পাতা খাওয়ার উপকারিতা ও নিয়ম

রান্নাঘরে অনেক মশলা ব্যবহার করা হয়, যা শুধু খাবারের স্বাদই বাড়ায় না স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। এর মধ্যে একটি হল কারি পাতা। এটি কারি পাতা এবং মিষ্টি নিম নামেও পরিচিত। ইংরেজিতে একে কারি পাতা এবং সংস্কৃতে কৃষ্ণ নিম্বা বলে সম্বোধন করা হয়। এর ঔষধিগুণ ও বৈশিষ্ট্য দেখে স্টাইলক্রেসের এই পোস্টে আজ আমরা কারি পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে এসেছি।

কারি পাতা খাওয়ার উপকারিতা

কারি পাতার অনেক উপকারিতা রয়েছে, যা বেশিরভাগ মানুষই হয়তো জানেন না। মনে রাখবেন কারি পাতা রোগ প্রতিরোধ বা উপসর্গ কমাতে উপকারী। এটাকে কঠিন রোগের প্রতিকার হিসেবে ভাববেন না।

ওজন কমাতে কারি পাতাঃ প্রথমে আপনি ওজন কমাতে কারি পাতার উপকারিতা সম্পর্কে জানবেন। ডাইক্লোরোমেথেন, ইথাইল অ্যাসিটেট এবং মহানিম্বিনের মতো বিশেষ উপাদান কারি পাতায় পাওয়া যায়। এই উপাদানগুলিতে ওজন কমাতে সাহায্য করে। কারি পাতায় কোলেস্টেরল কমানোর এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রয়েছে। এর ভিত্তিতে বলা যায়, ওজন কমাতে কারি পাতার ব্যবহার উপকারী।

রক্তশূন্যতায় কারি পাতাঃ রক্তশূন্যতার মতো সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে কারি পাতা সহায়ক। কারি পাতায় অ্যান্টি-অ্যানিমিয়া বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, যা রক্তস্বল্পতায় কার্যকরভাবে কাজ করে। এছাড়াও, কারি পাতা ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক এবং ভ্যানাডিয়ামের মতো খনিজগুলির একটি ভাল উৎস হিসাবে বিবেচিত হয়। রক্তশূন্যতা থেকে মুক্তি পেতে কারি পাতা উপকারী।

ডায়াবেটিসে সহায়কঃ কারি পাতার উপকারিতা সম্পর্কে বলতে গেলে, এর ব্যবহার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। কারি পাতায় হাইপোগ্লাইসেমিক অর্থাৎ চিনির মাত্রা কমানোর বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই গুণটি শরীরে চিনির পরিমাণ কমাতে সহায়ক। কারি পাতার উপকারিতা ডায়াবেটিসের মতো ঝুঁকি কমাতে সহায়ক প্রমাণিত।

লিভারের জন্য কারি পাতাঃ একটি গবেষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ট্যানিন এবং কার্বাজোল অ্যালকালয়েডের মতো উপাদান কারি পাতায় রয়েছে। এই উপাদানগুলির হেপাটোপ্রোটেকটিভ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা লিভারের কার্যকারিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি হেপাটাইটিস এবং সিরোসিসের মতো ঝুঁকি কমাতে সহায়। এর ভিত্তিতে লিভারের স্বাস্থ্যের জন্য কারি পাতার উপকারিতা রয়েছে।

ডায়রিয়া প্রতিরোধঃ কারি পাতার উপকারিতার মধ্যে রয়েছে ডায়রিয়া সংক্রান্ত সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া। কারি পাতায় পাওয়া কার্বাজোল অ্যালকালয়েডের রয়েছে ডায়রিয়া প্রতিরোধ করার আশ্চর্য ক্ষমতা। এটি বিশ্বাস করা যেতে পারে যে এটির নিয়মিত সেবন ডায়রিয়ার মতো সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে কার্যকর।

হার্ট সুস্থ রাখতে কারি পাতাঃ হার্ট সুস্থ রাখতেও কারি পাতার উপকারিতা পাওয়া যায়। ইঁদুরের উপর করা একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে কারি পাতা সেবন হৃদরোগ থেকে রক্ষা করতে সহায়ক হতে পারে। একই সময়ে, আরেকটি গবেষণা অনুসারে, কার্ডিওভাসকুলার রোগের চিকিত্সার জন্য একটি কার্যকর আয়ুর্বেদিক ওষুধ হিসাবে কারি পাতা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়াও গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে কারি পাতা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কাজ করে, যা হার্টকে সুস্থ রাখতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করতেঃ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কারি পাতা খাওয়ার উপকারিতা রয়েছে। কারি পাতার একটি অ্যান্টিঅক্সিডেটিভ প্রভাব রয়েছে, যা খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সহায়ক। কারি পাতাতে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলি শরীরে ভাল কোলেস্টেরলের (এইচডিএল) পরিমাণ বাড়াতে দায়ী। এর ভিত্তিতে, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কারি পাতার উপকারিতা রয়েছে।

সংক্রমণ প্রতিরোধে কারি পাতাঃ কারি পাতা সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। কারি পাতার তেলে পাওয়া কিছু পুষ্টি উপাদানে অ্যান্টিবায়োটিক এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। এটিতে পাওয়া একই বৈশিষ্ট্যগুলি ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাকের প্রভাব কমাতে উপকারী।

অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি প্রোপার্টি সমৃদ্ধঃ আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে অনেক ওষুধ তৈরিতে কারি পাতা ব্যবহার করা হয়। এটিতে প্রদাহ-বিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা প্রদাহজনিত সমস্যা থেকে ত্রাণ প্রদান করতে সাহায্য করে।

সকালের অসুস্থতার জন্য কারি পাতাঃ সকালের অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতে কারি পাতা খাওয়ার উপকারিতা রয়েছে। গর্ভাবস্থার সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে বমি বমি ভাব, সাধারণত বলা হয় সকালের অসুস্থতা। গবেষণা অনুসারে, গর্ভাবস্থায় কারি পাতার ব্যবহার বমি বমি ভাব নিরাময়ে সহায়ক। কারি পাতা এবং লেবুর রস চিনির সাথে মিশিয়ে খাওয়ার মাধ্যমে সকালের অসুস্থতা কাটিয়ে উঠতে পারে।

চোখের জন্য কারি পাতাঃ চোখের জন্য কারি পাতার উপকারিতা রয়েছে। কারি পাতা চোখের সুরক্ষার পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে। এর পেছনে কারণ হিসেবে ধরা হয় কারি পাতায় উপস্থিত ভিটামিন এ। কারি পাতার অপরিহার্য তেল চোখের জন্য উপকারী। কারি পাতার ব্যবহার চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

ত্বকের জন্য কারি পাতাঃ ত্বক সুস্থ রাখতেও কারি পাতার উপকারিতা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এতে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি অনেক সৌন্দর্য পণ্যে ব্যবহৃত হয়। এটি শুষ্ক ত্বককে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি ত্বকের টোন উন্নত করে। কারি পাতা যুক্ত ক্রিম সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে সুরক্ষা দেই। এর ব্যবহার প্রাকৃতিক রঙ্গকতা বজায় রাখতেও উপকারী। নিয়মিত ত্বকে কারি পাতার তেল লাগালে ব্রণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

চুলের জন্য কারি পাতাঃ ত্বকের পাশাপাশি কারি পাতার ব্যবহার চুলের জন্যও উপকারী। তাজা কারি পাতা নারকেল তেলে সিদ্ধ করে মাথার ত্বকে লাগাতে পারেন। এই মিশ্রণটি প্রয়োগ করলে চুলের স্বর বজায় রাখার পাশাপাশি চুলের বৃদ্ধিও উন্নত হয়।

কারি পাতার পুষ্টিকর উপাদান

নিচে কারি পাতায় উপস্থিত পুষ্টিকর উপাদানের কথা বলা হলঃ

পুষ্টি উপাদানপ্রতি 100 গ্রাম
ক্যালসিয়াম810 মিলিগ্রাম
ফসফরাস600 মিলিগ্রাম
আয়রন3.1 মিলিগ্রাম
ক্যারোটিন12600 আইইউ
নিকোটিনিক অ্যাসিড2.3 মিলিগ্রাম
ভিটামিন সি4 মিলিগ্রাম

নিয়মিত খাবারের পাশাপাশি চুল ও ত্বকের জন্যও কারি পাতা ব্যবহার করা যায়।

কারি পাতা খাওয়ার নিয়ম

কারি পাতা কীভাবে খেতে হয় তা জানতে চান, তাহলে খাবার রান্নার সময় মসলা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। কারি পাতা বিভিন্ন খাবারের স্বাদ বাড়াতে ব্যবহার করা হয়। যেমনঃ সবজি, মসুর ডাল, ভাত।

কারি পাতা নারকেলের চাটনিতে মিশিয়েও খাওয়ার যায়।

এটি ভাজা এবং খাবার সাজানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।

কারি পাতা ডাম্পলিং বানিয়ে খাওয়া যায়।

এর রস কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতেও খাওয়া যেতে পারে যেমন, একটি বিশেষ রোগ প্রতিরোধ করতে, তবে এর রস ব্যবহার করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

দ্রষ্টব্যঃ কারি পাতার প্রায় 8 থেকে 10 টি এককালীন খাবারে ব্যবহার করা যেতে পারে।

কারি পাতার ব্যবহার

চুলে কারি পাতার ব্যবহারঃ চুলের স্বাস্থ্যের জন্য এটি একটি পেস্ট তৈরি করে মাথার ত্বকে হেয়ার প্যাক হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। নারকেল তেলের সঙ্গে কারি পাতা গরম করে চুলে ব্যবহার ক্রা যায়। কারি পাতা পানিতে সিদ্ধ করে চুল ধোয়ার জন্য ব্যবহার করা যায়।

ত্বকের জন্য কারি পাতার ব্যবহারঃ এর পেস্ট ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে ব্যবহার করা হয়। পানিতে সিদ্ধ করে সেই পানি গোসলের জন্য ব্যবহার করলে ত্বক সংক্রান্ত রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

কারি পাতার অপকারিতা

যদিও কারি পাতার কোন ক্ষতি পরিলক্ষিত হয়নি, তবে কিছু পরিস্থিতিতে বা অতিরিক্ত ব্যবহার ক্ষতিকারক হতে পারে। এখানে আমরা কারি পাতার অপকারিতাগুলো বলছি, যা নিম্নরূপঃ

যাদের অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে তাদের কারি পাতা ব্যবহার করা উচিৎ নয়।

কারি পাতার হাইপোগ্লাইসেমিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পরিচিত। তবে এটি অতিরিক্ত পরিমাণে সেবন করলে রক্তে শর্করার পরিমাণ কম হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি যাদের রক্তে স্বাভাবিক শর্করা রয়েছে তাদেরও এমনটা হতে পারে কারি পাতা অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে।

কারি পাতার পেস্ট বা এর তেল লাগালে কিছু লোকের মধ্যে জ্বালাপোড়া হয়। তদের কারি পাতার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

কারি পাতার উপকারিতা সম্পর্কিত এই পোস্টি পড়ুন, আপনি অবশ্যই কারি পাতার উপকারিতা এবং অপকারিতা গুলোর সাথে ভালভাবে পরিচিত হয়ে গেছেন। তবে কারি পাতার অপকারিতা খুব বেশি নয়। পোস্টে আপনি শিখেছেন কীভাবে স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি কাটিয়ে উঠতে কারি পাতা ব্যবহার করা যায়। সুস্থ থাকার জন্য আজ থেকেই কারি পাতাকে আপনার ডায়েটের অংশ করে নিন।

সচরাচর জিজ্ঞাস্যঃ

আমি যদি নিয়মিত কারি পাতা সেবন করি তাহলে কি হবে?

কারি পাতা নিয়মিত সেবন অনেক স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য উপকারী। কারি পাতার হাইপোগ্লাইসেমিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অনেকাংশে সহায়ক।

দিনে কয়টি কারি পাতা খাওয়া যায়?

প্রতিদিন 2 গ্রাম অর্থাৎ 8-10টি কারি পাতা খাওয়া যায়।

কাঁচা কারি পাতা খাওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো?

হ্যাঁ, কাঁচা কারি পাতা খাওয়া আমাশয়ের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে উপকারী।

কারি পাতা কিভাবে পান করবেন?

কারি পাতার চা খাওয়া যায়।

Rate this post

Leave a Reply

Your email address will not be published.