গাজর খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা এবং নিয়ম

আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় গাজর অত্যন্ত প্রিয় ও প্রয়োজনীয় একটি সবজি৷ এটি আমরা সালাদ হিসেবেও খেতে পারি আবার সবজি হিসেবেও খেতে পারি।

সর্দি, কাশি সহ শীত কালীন রোগ থেকে রেহাই পেতে নিয়মিত খেতে হবে গাজর। বিটা ক্যারোটিন যুক্ত এই সবজিতে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকায় পুষ্টিবিজ্ঞানীরা গাজরকে রেখেছেন সুপার ফুডের তালিকায়।

সুগন্ধি পাতার চাহিদা মেটাতে গাজরের চাষ শুরু হলেও দিন শেষে বিজ্ঞানীরা পুষ্টি খুঁজে পান গাজরের মূলেই। তাই সময়ের আবর্তনেই এখন গাজরের পাতার চেয়ে মূলের চাহিদাই বেশি।

মূল জাতীয় সবজি গাজরের আদি নিবাস দক্ষিন-পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপে হলেও পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক গাজর উৎপাদিত হয় চীনে।

পুষ্টিকর, সুস্বাদু, আশ সমৃদ্ধ শীতকালীন এই সবজি টি তরকারি এবং সালাদ দুই ভাবেই খাওয়া যেতে পারে। তবে পুষ্টির অপচয় রোধে রান্নার চেয়ে কাচা গাজর খাওয়ার পরামর্শ পুষ্টি বিজ্ঞানীদের৷

গাজরের উপকারিতা ও অপকারিতা

পুষ্টি বিজ্ঞানীরা বলছেন গাজরে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। রঙিন সবজি গাজরের বিটা ক্যারোটিন দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক। এছাড়াও ঝুঁকি কমায় মানবদেহের ক্যালকেরিনল ক্যান্সারের।গাজরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের আছে অ্যান্টিএজিং ক্ষমতা যা বয়সের ছাপ দূর করে ও ত্বককে করে উজ্জ্বল। আর ক্যারোটিনয়েড ত্বককে করে লাবণ্যময়।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে যারা সপ্তাহে ৬ টির বেশি গাজর খেয়েছেন তাদের স্ট্রোক এর সম্ভাবনা অনেকটাই কম। তাই পুষ্টিবিজ্ঞানির পরামর্শ হার্টকে সুস্থ রাখতে কোলেস্টেরল ও ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে রোজকার খাদ্য তালিকায় গাজর রাখার। তবে যারা নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন তাদের জন্য গাজর খাওয়ায় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ।

গাজরের পুষ্টি উপাদান

প্রতি 100 গ্রাম গাজরে 172 কিলোক্যালরি শক্তি, 2.8 গ্রাম ডায়েটি ফাইবার, 9.6 গ্রাম চিনি বা শর্করা এবং 0.93 গ্রাম প্রোটিন রয়েছে। এটিতে কিছু ভিটামিন রয়েছে যেমন 835 মিলিগ্রাম বিটা ক্যারোটিন, 0.6 মিলিগ্রাম ভিটামিন ই, 5.9 মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, 0.138 মিলিগ্রাম ভিটামিন বি -6 রয়েছে।

গাজরে বিভিন্ন খনিজ থাকে। প্রতি 100 গ্রাম গাজরে 320 মিলিগ্রাম পটাসিয়াম, 35 মিলিগ্রাম ফসফরাস, 33 মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, 69 মিলিগ্রাম সোডিয়াম এবং 12 মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে।

মজার বিষয় হল, গাজরে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বিটা ক্যারোটিন উপস্থিতির কারণে, গাজর উজ্জ্বল কমলা রঙের হয়ে থাকে। এই বিটা ক্যারোটিন যখন আমাদের পেটে পৌঁছে যায় তখন বিপাক প্রক্রিয়াতে আমরা এর থেকে ভিটামিন এ পাই।

গাজরের অন্যান্য পুষ্টির মধ্যে রয়েছে ভিটামিন কে, ফাইবার, ফোলেট, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস এবং ভিটামিন ই। গাজর বিভিন্ন ভিটামিন এবং খনিজ দ্বারা পরিপূর্ণ যা শরীরকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।

গাজর খাওয়ার উপকারিতা

চোখের জন্যঃ গাজরে থাকা বিটা ক্যারোটিন এবং ভিটামিন এ চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে।

কেটে বা পুড়ে গেলেঃ শরীরের কোথাও কেটে গেলে বা হালকা পুড়ে গেলে গাজর কেটে বা পেস্ট তৈরি করে লাগান এতে জ্বালা ভাব কমে যাবে।

কৃমি থেকে মুক্তিঃ পেটের কৃমি দূর করতে নিয়মিত গাজরের জুস বা তরকারি বানিয়ে খান।

ত্বকের জন্যঃ সুন্দর ত্বকের জন্য গাজর খেতে পারেন। এটা আপনার ত্বককে ভেতর থেকে সুন্দর করে তুলতে সাহায্য করে। এর ভিটামিন এ ও এন্টিওক্সিডেন্ট আপনার ত্বকের রোদে পোড়া ভাব দূর করবে। সেই সাথে ভিটামিন এ ত্বকের অযাচিত ভাজ পড়া, কালো দাগ, ব্রণ, ত্বকের রঙের অসামাঞ্জস্যতা ইত্যাদি দূর করে আপনাকে সুন্দর হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।

অর্শ থেকে মুক্তিঃ অর্শ থেকে মুক্তি পেতে নিয়মিত গাজর খান।

ফোড়া থেকে মুক্তিঃ ফোড়া হলে গাজরের পাতা বেটে ফোড়ার ওপরে লাগান এতে ফোড়া পেকে যাবে। এছাড়াও কোথাও ব্যাথা হলে এর ব্যবহার করতে পারেন।

রক্তহীনতা হলেঃ শরীরের রক্তহীনতা দূর করতে গাজরের জুস খান।

সাইনাস থেকে মুক্তিঃ সাইনাস বা মাইগ্রেনের জন্যে গাজরের পাতা হালকা সেকে নিয়ে রস বের করে ৩-৪ ফোটা নাকের মধ্যে দিন। উপকার পাবেন।

ঋতুস্রাব এর সময়ঃ ঋতুস্রাব এর সময় পেটে ব্যাথা দূর করতে নিয়মিত গাজরের তরকারি খান।

ক্যান্সার প্রতিরোধেঃ গাজরে থাকা বিটা ক্যারোটিন প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। গাজরে আছে falcarinol এবং falcarindiol যা আমাদের শরীরে এন্টিক্যান্সার উপাদান গুলোকে রিফিল করে।

তাই গাজর খেলে ব্রেস্ট, কোলন, ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।

কোষ্ঠকাঠিন্যঃ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে নিয়মিত গাজরের জুস বা গাজরের তরকারি খান।

গাজর খাওয়ার অপকারিতা

যেহেতু গাজর সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যকর খাবার তাই আপনি হয়তো এটি খুব বেশি পরিমাণে গ্রহণ করেছেন। তবে এর অতিরিক্ত ব্যবহার সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করুন। করণ! যদি আপনি এটির অত্যধিক পরিমাণ গ্রহণ করেন তবে আপনি কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনুভব করতে পারেন। এটি নীচে উল্লেখ করা হয়েছে:

গাজর বিটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ। যা আপনার দেহে ভিটামিন এ এর ঘাটতি দূর করে। তবে আপনি যদি এটির বেশি পরিমাণ গ্রহণ করেন তবে এটি আপনার ত্বকের রঙ পরিবর্তন করতে পারে।

গাজর থেকে আপনার অ্যালার্জি হতে পারে।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে গাজর কাঁচা বা সিদ্ধ খাবেন না। কারণ! গাজরে প্রচুর পরিমাণে মিষ্টি থাকে। এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

প্রচুর গাজর সেবন করার ফলে ত্বকের রঙ হলুদ হয়ে যায় এবং শিশু এবং ছোট বাচ্চাদের দাত ক্ষয় হতে পারে।

প্রচুর গাজর খেলে আপনার শরীরের ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়াম, দস্তা জাতীয় খনিজগুলির শোষণকে প্রভাবিত করতে পারে।

আপনি যদি সঠিক পরিমাণে গাজর খান তবে আপনার হজমে উন্নতি ঘটতে পারে। অন্যদিকে এর চেয়ে বেশি গাজর খেলে গ্যাস, ডায়রিয়া, পেট, পাকস্থলির মতো পাচনজনিত ব্যাধি হতে পারে।

গাজরের রস অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়া মহিলাদের বুকের দুধের স্বাদ বদলে যেতে পারে।

এই জিনিসগুলি মাথায় রাখুন এবং সুস্বাদু গাজর খান এবং রোগগুলিকে বিদায় জানিয়ে আপনার স্বাস্থ্য ভাল রাখুন।

Rate this post

Leave a Reply

Your email address will not be published.