ঘি এর উপকারিতা ও অপকারিতা এবং ব্যবহার

বাঙালিদের কাছে একটি লভোনীয় খাবার হলো ঘি। ঘি এর কথা উঠলেই আমাদের বেশির ভাগ বাঙালির কল্পনায় ভেসে ওঠে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত এ এক চামচ ঘি। তবে এ কথা ঠিক যে ২১ শতকের স্বাস্থ্য সচেতন বাঙালিরা অনেকেই ঘি খেতে পছন্দ করেন না, পাছে ওজন বেড়ে যায়! সেই ভয়ে তারা যেমন ভাতের পরিমাণে অনেকটা দারি টেনেছেন তেমনই রোজের ডায়েট থেকে বাদ পড়েছে ঘি ও। কারণ অধিকাংশের ই ধারণা ঘি মানেই হার্টের অসুখের ভয়। এই ভয় টা কিন্তু আগে ছিলো না৷

কয়েকশ বছর ধরে বাংলাদেশের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতের অন্যতম প্রধান প্রয়োজনীয় উপকরণ ছিলো ঘি। কিন্তু ১৯৮০ এর দশক থেকে হঠাৎ আমরা শুনতে শুরু করলাম ঘি হলো হার্টের চরম শত্রু। রোজ ঘি খেলে নাকি হার্ট ব্লক হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।এই প্রচারের পেছনে রিফায়িন ওয়েল প্রস্তুতকারক দের পরিকল্পিত প্রয়াস ছিলো বলে মার্কেটিং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কারণ ঘি এর বিক্রি কমানো না গেলে রিফায়িন ওয়েল এর বিক্রি বাড়ানো যাচ্ছিলো না। কিন্তু আজব ব্যাপার চিকিৎসা বিজ্ঞান অন্য কথা বলছে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে ঘি খাওয়ার সঙ্গে শরীর খারাপ হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই বরং মস্তিষ্ক থেকে পা এর নখ পর্যন্ত শরীরের একাধিক অঙ্গের সচলতা বৃদ্ধিতে ঘি এর বিকল্প হয় না এ কথা বলাই যায়।

ঘি নিয়ে এই বিভ্রান্তি গুলো দূর করার জন্য ঘি এর উপকারিতা গুলো সম্পর্কে আমাদের জানা জরুরি। ঘি এর মধ্যে থাকে ভিটামিন এ, ডি,কে এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান। এক চামচ ঘি এর মধ্যে থাকে প্রায় ১৩৫ ক্যালরি এবং ৪৫ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল। তবে ঘি এর মধ্যে কিন্তু সোডিয়াম, কার্বোহাইড্রেট,প্রোটিন, ফাইবার বা সুগার থাকে না।

প্রতিদিন অল্প করে হলেও ঘি খাওয়া দরকার। ঘি হজম শক্তির উন্নতি ঘটায়। খাবার হজম করতে সহায়ক নানাবিধ স্টমাক এসিডের ক্ষরণ বাড়াতে ঘি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ফলে বদ হজম ও গ্যাস এর সমস্যা অনেকাংশেই হ্রাস পায়।নিউট্রিশিয়ান দের মতে ঘি এর উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে খিচুড়ি বা পুরানো খাবার ঠিক মতো হজম করতে এসবের সঙ্গে ঘি খাওয়া টা খুব ই জরুরি। করণ ঘি যেকোনো ধরনের রিচ খাবারকে সহজে হজম করতে সাহায্য করে। আর সে কারনেই বোধহয় বিরিয়ানি তে ঘি টা অবশ্যই দেয়া হয়।

তাই হজম শক্তির উন্নতির জন্য ঘি আপনাকে বিশেষ উপকার দেবে এ কথা বলাই যায়।সেই সঙ্গে আমাদের মূল্যবান সম্পদ চোখ কে ভালো রাখতে,আপনার দৃষ্টি শক্তির উন্নতি ঘটাতে পারে ঘি। নিয়মিত ঘি খেলে দৃষ্টি শক্তির উন্নতি ঘটে। সেই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই শক্তিশালী হয় নিয়মিত ঘি খাওয়ার ফলে। আরও বিষ্ময়কর বিষয় হলো ঘি ব্রেন টনিক হিসেবে কাজ করে। নিউট্রিশনিষ্ট দের মতে নার্ভের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সার্বিক ভাবে ব্রেন পাওয়ারের উন্নতি তে ঘি এর কোনো বিকল্পই হয় না।

ঘি তে রয়েছে ওমেগা-৬ এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যা শরীর এবং মস্তিষ্ককে চাঙ্গা রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলি সম্প্রতি প্রকাশিত বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে এই দুই ধরনের ফ্যাটি এসিড ডিমেনশিয়া এবং অ্যালজাইমার মতো রোগের প্রকোপও কমাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই নিয়ম করে যদি অল্প করেও ঘি খাওয়ার অভ্যাস করে থাকেন তাহলে এই সব রোগ থেকে দূরে থাকা যাবে।

ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য রোগ কেও দূরে রাখতে পারে এই ঘি। ঘি তে রয়েছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যা শরীরে উপস্থিত ফ্রি র‍্যাডিকেল কে ক্ষতি করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে কোষের বিন্যাসে পরিবর্তন হয়ে ক্যান্সার হওয়ার আশংকা টাই থাকে না।

গরুর দুধের ঘি এর উপকারিতা

এক চা চামচ গরুর দুধের ঘি গরম পানি দিয়ে খেলে শ্বাস প্রশ্বাস সহজ হয়। এবং শুকনো কাশি নিরাময় হয়। দুধের পুষ্টি উপাদান ও উপকারিতা সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের এ প্রতিবেদনটি পড়ুন ।

  • প্রতিদিন ২ ফোঁটা গরুর দুধের দেশী ঘি গ্রহণ করলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
  • প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ১-২ চা চামচ গরুর দুধের ঘি খেলে ধমনী ঘন হয় না। রক্ত প্রবাহও উন্নত করে।
  • গাভীর দুধের ঘি বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত জীবাণু, ধোঁয়া এবং দূষণ থেকে অ্যালার্জি কমায়।

এছাড়াও গলা, নাক এবং বুকে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে। স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিরা বিশ্বাস করেন যে, ওজন হ্রাস করার জন্য চর্বিবিহীন খাবার খাওয়ার অনুশীলন সর্বোত্তম বিকল্প হতে পারে। তবে সব ধরণের ফ্যাট স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ নয়।

শরীরে এমন কিছু ফ্যাট রয়েছে যা আপনার সামগ্রিক বৃদ্ধির জন্য ভাল হতে পারে।

গরু ঘিও এমন একটি স্বাস্থ্যকর ফ্যাট যা খাওয়ার অনেক উপকার রয়েছে।

হজম উন্নতিঃ আয়ুর্বেদের মতে, গরুর ঘি অন্ত্রের শোষণ ক্ষমতা উন্নত করে। গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্টের অ্যাসিডিক পিএইচ হ্রাস করে। এটি ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের সমৃদ্ধ উৎস যা কোলেস্টেরল হ্রাস করে। গরুর ঘি একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট যা ফ্রি র্যাডিকেলগুলি নির্মূল করে এবং জারণ প্রক্রিয়াটিকে বাধা দেয়। আমাদের পেশীর উন্নতি করে। অকাল বার্ধক্য রোধ করে। এটি আলঝাইমার রোগ প্রতিরোধ করে।

ত্বকের উপকারঃ ঘি আমাদের শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থগুলি সরিয়ে দেয়। এছাড়াও চুল এবং ত্বককে স্বাস্থ্যকর রাখে এবং হাড়কে শক্তিশালী করে তোলে।

শরীরকে সুস্থ রাখুনঃ আপনি যদি অতিরিক্ত ওজন পেতে না চান তবে গরু ঘি সেবন করুন। আপনি যদি বেশি পরিমাণে ঘি ব্যবহার করেন তবে রক্তের ধমনীগুলি ঘন হতে শুরু করবে। এটি শরীরের চর্বি জমা হওয়ার কারণ এবং বিপাক হ্রাস করে। তাই গরুর ঘি খেতে চেষ্টা করুন।

পুরাতন ঘি এর উপকারিতা

স্ফুটনাঙ্কঃ পুরাতন ঘি’র স্ফুটনাঙ্ক অনেক বেশি। ২৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত তাপে ঘি গরম করা যায়। অধিকাংশ তেলই এই তাপমাত্রায় গরম করলে ক্ষতিকারক হয়ে যায়।

নষ্ট হয় নাঃ ঘি সহজে নষ্ট হয় না। প্রায় ১০০ বছর পর্যন্ত ঘি’র গুণাগুণ ঠিক থাকে।

স্বাদ ও গন্ধঃ পুরাতন ঘি’র সুন্দর গন্ধ ও স্বাদ ভোজনবিলাসীদের সবসময়ই টানে। আবার অধিকাংশ দুগ্ধজাত দ্রব্যের মতো ঘি থেকে অ্যালার্জি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

ভিটামিনঃ ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ই’ থাকায় ঘি পুষ্টিগুণে ভরপুর।

কনজুগেটেড লিনোলেক অ্যাসিডঃ এই অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের অ্যান্টি-ভাইরাল গুণ রয়েছে। যা ক্ষত সারাতে সাহায্য করে। ডেলিভারির পর নতুন মায়েদের ঘি খাওয়ানো হয় এই কারণেই।

ওজন ও এনার্জিঃ পুরান ঘি’র মধ্যে থাকা মিডিয়াম চেন ফ্যাটি অ্যাসিড খুব এনার্জি বাড়ায়। অধিকাংশ অ্যাথলেট দৌড়নোর আগে ঘি খান। ঘিবখেলে ওজনও কমে যায়।

হজম ক্ষমতাঃ ঘি’র মধ্যে আছে বাটাইরিক অ্যাসিড। এই অ্যাসিড হজম ক্ষমতা বাড়ায়।

রোগ প্রতিরোধঃ বাটইরিক অ্যাসিড শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

খিদে বাড়ায়ঃ হজম ক্ষমতা বাড়ানোর কারণে ঘি খেলে খিদে বাড়ে এবং ক্ষুধামন্দা কমে যায়।

পজিটিভ ফুডঃ বহু প্রাচীন কাল থেকেই ঘি পজিটিভ ফুড হিসেবে সুপরিচিত। আধুনিক গবেষণাও বলছে ঘি খেলে পজিটিভিটি বাড়ে। কনশাসনেস উন্নত হয়।

বাচ্চাদের ঘি খাওয়ার উপকারিতা

আপনি কি জানেন বাজারে যত ফ্যাট পাওয়া যায় তার মধ্যে ঘি সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং স্বাস্থ্যকর। নির্দিষ্ট পরিমান ঘি একটি শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে আবশ্যক। আর তাই আজ আমরা জানবো, শিশুর সুস্বাস্থ্য গঠনে ঘি কতখানি দরকারিঃ

১. ঘি চর্বির জন্য একটি হেলদি উৎস এবং দৈহিক শক্তির জন্য উত্তম উৎস যা শৈশবের সময় দৈহিক বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য প্রয়োজন।

শৈশব থেকে সুসাস্থের অধিকারী হবার জন্য ঘি অন্যতম। এতে থাকা প্রাকৃতিক চর্বি এবং এনার্জি সঠিক গ্রোথ এবং ডেভেলপমেন্টে কাজ করে। সাধারনত জন্মের সময়ের ওজন ১ বছরে তিনগুন হয় এটাই স্বাভাবিক। কাজেই ৬ মাসের পর থেকে বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবারে একটু ঘি শিশুর সঠিক ওজন ধরে রাখতে সাহায্য করে।

২. যেহেতু শৈশবের সময় গ্রোথ রেট হাই থাকে তাই বাচ্চার শরীর বেশী পরিমানে ক্যালোরি চায়। ১ গ্রাম ঘিতে ৯ ক্যালোরি থাকে। কাজেই খাবারে ঘির পরিমান যোগ করা যেমনি সহজ তেমনি শিশুকে একটিভ রাখার স্বাস্থ্যকর উপায়।

৩. প্রথম এক বছর শিশুর মস্তিক গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। সুস্থ পরিবেশ এবং পুষ্টিকর খাবার মস্তিক গঠনে সাহায্য করে। আর এই মস্তিস্কের ৬০% তৈরি হয় ফ্যাট থেকেই। Docosahexaenoic acid (DHA) এক ধরনের হেলদি ফ্যাট যা ব্রেন গ্রোথ এবং ডেভেলপমেন্টের জন্য দায়ি। এবং রিসার্চে পাওয়া গেছে যে বাড়িতে তৈরি করা ঘিতে প্রচুর পরিমানে DHA বিদ্যমান থাকে। তাই খাবারে ঘি যোগ করে শিশুর ব্রেন ডেভেলপমেন্ট প্রসেসকে বুস্ট করবে। শুধু তাই নয় এই ডিএইচএ ব্রেন ডেভেলপমেন্টের সাথে সাথে চোখের জুতি বাড়াতে সাহায্য করে।

৪. এছাড়া ঘি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান সমূহের একটি দারুণ উৎস। অতএব আপনার শিশুর খাদ্যে ঘি যোগ করা মানে সংক্রমণ এবং রোগের সূত্রপাত রোধ করা।

৫. ঘি ভিটামিনে থাকা দ্রবণীয় চর্বি শোষণ করতে সাহায্য করে। যদি খাবারে ঘি যোগ করা হয় তবে শিশু সহজে ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে শোষণ করতে পারে। এই ভিটামিন পরিপূর্ণ শোষণের ফলে শিশুর হেলদি গ্রোথ ডেভেলপমেন্টের পাশাপাশি ইমিউন সিস্টেমকে বুস্ট করে ঘি।

শীতকালে ঘি খাওয়ার উপকারিতা

একাধিক গবেষণায় পর একথা পরিষ্কার যে প্রতিদিন ১-২ চামচ ঘি খাওয়া স্বাস্থ্যকর অভ্য়াস। কেন? কারণ এই খাবারটি খাওয়া মাত্র শরীরে একাধিক উপকারি ভিটামিন, মিনারেল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের প্রবেশ ঘটে। ফলে সব দিক থেকে শরীর এতটাই চাঙ্গা হয়ে ওঠে যে একাধিক রোগ শরীরের ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন ডায়েটে ঘিকে অন্তর্ভুক্ত করলে শীতকালে বারে বারে সর্দি-কাশি এবং জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা যেমন কমে, তেমনি আরও নানাবিধ উপকার পাওয়া যায়। যেমন ধরুন…

ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়ঃ আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে ঘি হল হল প্রকৃতিক ময়েশ্চারাইজার, যা ত্বক এবং ঠোঁটের হারিয়ে যাওয়া আদ্রতা ফিরিয়ে আনতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন অল্প পরিমাণ ঘি-এর সঙ্গে যদি সামান্য় পানি মিশিয়ে মুখে লাগাতে পারেন, তাহলে ত্বকের বয়স কমে চোখে পরার মতো। যার কারনে ত্বকের সৌন্দর্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ত্বকের সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে আমাদের এই আর্টিকেলগুলো পড়তে পারেন ।

দেহের তাপমাত্রা বেড়ে যায়ঃ বেশ কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে ঘি খাওয়া মাত্র দেহের ভিতরে এমন কিছু পরিবর্তন হতে শুরু করে যে শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে। এই কারণেই তো ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে শীতকালে বেশি করে ঘি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা।

চোখের ক্ষমতা বাড়েঃ বেশ কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে নিয়মিত ঘি খাওয়া শুরু করলে দেহে ভিটামিন এ-এর ঘাটতি দূর হয়। ফলে দৃষ্টিশক্তির যেমন উন্নতি ঘটে, তেমনি ছানি পরা, বা গ্লকোমার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও যায় কমে। যারা সারাদিন কম্পিউটারে কাজ করেন, তারা নিয়মিত ঘি খেতে ভুলবেন না যেন!

খুশকির প্রকোপ কমেঃ খেয়াল করে দেখবেন শীতকালে ড্যানড্রাফের মতো ত্বকের রোগের প্রকোপ বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। তাই তো এই সময় ঘি-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব করাটা মাস্ট! কিন্তু ঘি-এর সঙ্গে খুশকির চিকিৎসার কী সম্পর্ক? আসলে, নিয়মিত স্কাল্পে ঘি লাগিয়ে মাসাজ করার পর হালকা গরম পানি দিয়ে তা ধুয়ে ফেললে খুশকির প্রকোপ কমতে একেবারেই সময় লাগে না।

ভিটামিনের শোষণ ঠিক মতো হয়ঃ বেশ কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে ঘিতে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে প্রবেশ করার পর এমন খেল দেখায় যে শরীর দ্বারা ভিটামিনের শোষণ বেড়ে যায়। ফলে দেহের অন্দরে কখনও ভিটামিনের ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। সেই সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে ছোট-বড় কোনও রোগই ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না।

পুষ্টির ঘাটতি দূর হয়ঃ একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে প্রতিদিন ঘি খাওয়া শুরু করলে দেহের অন্দরে একদিকে যেমন ভিটামিন এ এবং ই-এর ঘাটতি দূর হয়, তেমনি অ্যান্টি-অ্যাক্সিডেন্টের মাত্রাও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ফলে পুষ্টির ঘাটতি দূর হওয়ার পাশাপাশি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও এতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে ছোট-বড় কোনও রোগই ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না।

গর্ভাবস্থায় ঘি

এটি একটি পরিচিত সত্য যে একটি গর্ভবতী মহিলার জন্য সুষম খাদ্য এবং পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায়, একজন মহিলার স্বাস্থ্যকর ফ্যাটও গ্রহণ করা প্রয়োজন। ঘি ফ্যাটের উত্স এবং তাই গর্ভবতী মহিলার ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তবে তার আগে এটি অবশ্যই চিকিত্সকের সাথে পরামর্শের পরে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

ঘি ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ওমেগা–৯ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। ঘিয়ের অনেক স্বাস্থ্যকর উপকারিতা রয়েছে, তবে গর্ভাবস্থায় এর উপকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয় না।তবে, ঘি নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে একজন গর্ভবতী মহিলাকে উপকৃত করে বলে বিশ্বাস করা হয়।

এটি গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি দিতে পারে।

এটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করতে পারে।

এটি একটি মহিলার হজম ক্ষমতাকে উন্নত করতে সহায়তা করে।

এটি শিশুর লালনপালনে সহায়তা করে।

এটি প্রসব শ্রমে স্বাচ্ছন্দ্যে সহায়তা করে।

বাজার থেকে সংগ্রহ করা ঘি বা স্বচ্ছ মাখনের তুলনায় বাড়ির তৈরি ঘি একটি ভাল এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প। আপনি প্রথম ত্রৈমাসিকে দেশি ঘি খাওয়া শুরু করতে পারেন, তবে আপনার যদি খুব বেশি ওজন বেড়ে যায় বা যদি ইতিমধ্যে আপনার ওজন বেশি হয় তবে আপনার চিকিত্সকের সাথে পরামর্শের পরেই কেবলমাত্র ডায়েটে দেশি ঘি অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ডায়েট গর্ভাবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন হবু মায়ের পক্ষে তার ক্রমবর্ধমান ভ্রূণের প্রতি ভাল পুষ্টি সরবরাহের জন্য সুষম খাদ্য গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিশ্বাস করা হয় যে ঘি যোনিতে লুব্রিকেট করে এবং স্বাভাবিক প্রসবে সহায়তা করে। এটাও বিশ্বাস করা হয় যে এটি প্রসব শ্রমের ব্যথা সহজ করে এবং সংকোচনের উত্তেজনার ক্ষেত্রেও কার্যকর। যাইহোক, এই বিশ্বাসগুলি কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয়। একজন গর্ভবতী মহিলার ক্রমবর্ধমান ভ্রূণের পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য কেবল ৩৫০ অতিরিক্ত ক্যালোরি প্রয়োজন। এই অতিরিক্ত ক্যালোরিগুলি একটি ভাল ডায়েট খাওয়ার মাধ্যমে পাওয়া যায়, যাতে ঘিও অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। তবে প্রচুর পরিমাণে ঘি সেবন করলে ওজন বাড়তে পারে। ওজন বৃদ্ধি যদি উদ্বেগজনক হয়, তবে আপনার ঘিয়ের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত।

গর্ভাবস্থায় দেশি ঘি খাওয়ার সাথে সম্পর্কিত প্রচুর কল্পকথা রয়েছে। এটি সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যকর, সন্দেহ নেই, তবে অনেক লোক বিশ্বাস করেন যে এর সাথে ঘি যুক্ত দুধ পান করা গর্ভবতী মহিলা এবং তার অনাগত সন্তানের অতিরিক্ত পুষ্টি ও ক্যালোরি সরবরাহ করতে পারে। এটিও বিশ্বাস করা হয় যে এটি যোনিতে তৈলাক্তকরণের মাধ্যমে প্রসব প্রক্রিয়াটিকে সহায়তা করে। অনেকে মনে করেন যে গর্ভাবস্থার নবম মাসের ডায়েটে ঘি অন্তর্ভুক্ত করা স্বাভাবিক প্রসবে সহায়তা করে। যাইহোক, এগুলি কেবল কল্পকথা, তাই আপনার এর স্বাদ পছন্দ বলে কেবলমাত্র আপনার ডায়েটে ঘি যোগ করবেন না। আপনি যদি গর্ভাবস্থায় ঘি খেতে চান, তবে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শের পরে তবেই এটি করতে পারেন।

ঘি এর ব্যবহার

শীতে ঘি এর ব্যবহারঃ শীত মানে শুষ্কতা। প্রকৃতি থেকে এ শুষ্কতা পৌঁছে যায় আমাদের ত্বকে। বিশেষ করে শুষ্ক ত্বকের অধিকারী যারা, তারা জানেন এর বিপত্তিটা। তাই খাওয়ার পাশাপাশি হাতে একটু ঘি নিয়ে আলতো করে মুখে ও হাতে মেখে নিন।

খাবার হিসেবেঃ রান্নার সময় বিশেষ করে সবজি রান্নার কাজে ব্যবহার করতে পারেন এটি। সকালের নাশতা হিসেবে যারা নিয়মিত টোস্ট খান, তারা এর সঙ্গে সামান্য ঘি মাখিয়ে নিতে পারেন। খেতে মজা পাবেন পাশাপাশি এটি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে খেয়াল রাখুন এর পরিমাণের ওপর। কোনো খাবারই যেমন অতিরিক্ত গ্রহণ করা উচিত নয়, ঘিও তাই। কারণ এতে রয়েছে কোলোস্টেরল। তাই নিয়মিত পরিমিত ঘি খেতে পারেন।

রূপচর্চাঃ রাতে বিছানায় যাওয়ার আগে ভালো করে মুখ ধুয়ে নিন। এক চামচ ঘি নিয়ে আপনার চোখের চারপাশে মাখুন। এবার সারা মুখে আলতো করে লাগিয়ে নিন। আই ক্রিমের পাশাপাশি এটি ত্বকে ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে ত্বকে শুষ্কতা দূর করতে এটি উপকারী।

কোষ্ঠকাঠিন্যঃ ঘিয়ের মধ্যে রয়েছে ন্যাচারাল লুব্রিকেটিং, যা এক ধরনের পিচ্ছিল উপদান। যারা কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছেন, তারা এক কাপ দুধের মধ্যে এক চামচ ঘি মিশিয়ে কিছুক্ষণ চুলার ওপর রাখুন। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এটি পান করুন।

রাগ প্রশমন

বিশেষ কোনো কারণে কিংবা বিনা কারণে খুব রেগে গেছেন। গ্লাস ভাঙে কিংবা কুটিকুটি করে কাগজ ছিঁড়েও কাজ হচ্ছে না। হাতে একটু ঘি নিয়ে নাকে লাগান। এবার স্বাভাবিকভাবে নিশ্বাস নিন। দেখবেন এর সুগন্ধটা আপনার মন আর মস্তিষ্ককে বশে এনে ফেলেছে। আর রাগের বিষয়টি— ততক্ষণে ভুলে গেছেন আপনি।

সাবধানতাঃ

হার্টের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস অথবা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় যারা ভুগছেন তাদের ভুলেও ঘি খাওয়া চলবে না।

আবার অতিরিক্ত ঘি খাওয়াও স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও ভালো নয়। কেউ যদি অনিয়ন্ত্রিত হারে ঘি খাওয়া শুরু করেন, তাহলে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই হার্টের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে।

চিকিৎসকদের মতে শরীরকে সুস্থ রাখতে দৈনিক ২ চামচের বেশি ঘি খাওয়া একেবারেই চলবে না।

সর্বোপরি দেহের সুস্থতার জন্য অবশ্যই খাটি ঘি পরিমাণ মতো খেতে হবে।

5/5 - (22 Reviews)

Leave a Reply

Your email address will not be published.