দুধ দিয়ে ত্বকের যত্ন এবং চুলের যত্ন নেয়ার নিয়ম

একটা শিশু একদম ছোট বয়স থেকে যে পুষ্টি সোর্স এর সাথে সবচেয়ে পরিচিত হয়ে আসে তা হলো দুধ। শিশু থেকে যেকোনো বয়সের মানুষ এর দুধ খাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের শরীর, ত্বক,হাড়ের গঠন এমনকি সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও দুধের ভূমিকা রয়েছে।

দুধে তেমন কোনো স্বাদ না থাকায় বাচ্চারা সহজেই সেবন করতে চায় না। সেক্ষেত্রে কখনো হরলিক্স, কখনো বাদাম গুড়ো, কখনো চিনি মিশিয়ে ও আপনারা বাচ্চাদের খাওয়ানোর চেষ্টা করে থাকেন।

দুধের পুষ্টিগুন অনেক তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। দুধে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, খনিজ উপাদান, ফ্যাট ইত্যাদি নানা উপাদান রয়েছে। দুধ নিয়মিত খেলে মানুষের যেমন শরীরবৃত্তীয় কিছু উন্নতি হয়, তেমনি এর নিয়মিত ব্যবহার এ ত্বক এবং চুলের ও নানা উন্নতি সাধন করা সম্ভব। আজকে জেনে নিবো দুধ দিয়ে ত্বকের যত্ন এবং চুলের যত্ন কিভাবে করতে পারি তার নিয়মাবলি সম্পর্কে।

সতর্কতাঃ

শুরুতেই একটু সতর্কতা দিয়ে নিতে চাই। কারণ কখনো কখনো আমাদের ছোট কিছু জ্ঞানের ত্রুটির কারণে আমাদের ত্বক বা চুলের বিশাল ক্ষতিসাধন করে ফেলি।

ত্বক বা চুলে কখনোই একবার বা অনেকবার করে চুলোয় জ্বাল দেয়া দুধ ব্যবহার করা যাবেনা।সবসময়ই কাচা দুধ ব্যবহার এর অভ্যাস করতে হবে। এবং যেকোনো প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার এর পূর্বে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করে নিতে হবে। কারো যদি দুধে এলার্জি থাকে তাহলে এই পোস্ট আপনাদের জন্য নয়।

দুধ দিয়ে ত্বকের যত্ন নেয়ার নিয়ম

• ত্বকের যত্নে প্রাকৃতিক স্ক্রাব হিসেবে দুধের ব্যবহার

আমাদের ত্বকের উপরে ডেড সেল বা মরা চামড়া থাকে। আমরা যতই স্কিন কেয়ার করি না কেনো এই মরা চামড়া অধিক পরিমাণে ফেইস এ জমে গেলে কোনো স্কিন কেয়ারই কাজ করবে না। তাই সপ্তাহে দু’দিন এই ডেড সেল পরিষ্কার করা উচিৎ।

এর জন্য প্রাকৃতিক উপাদান দুধ এবং চিনির একটি স্ক্রাব বা ফেইসপ্যাক ব্যবহার করতে পারেন। এই স্ক্রাব বা ফেইসপ্যাক ত্বক থেকে মরা চামড়া দূর করবে এবং ত্বকের উজ্জলতা অনেকটাই বাড়িয়ে দিবে।

কিন্তু এরকম ফেইসপ্যাক ব্যবহার করার পর অনেক সময় ত্বকে পোরস ওপেন হয়ে যায় তাই এই স্ক্রাব ব্যবহারের পর আপনি পোর মিনিমাইজিং কোনো ফেসপ্যাক ব্যবহার করলে অনেক ভালো ফলাফল পাবেন।

আরো পড়ুনঃ দুধের উপকারিতা, ডাবের পানির উপকারিতা জেনে নিন কেন খাবেন

স্ক্রাব বানানোর নিয়ম এবং ব্যবহার এর প্রক্রিয়া

মিল্ক ফেসিয়াল
মিল্ক ফেসিয়াল

একটি বাটিতে অল্প পরিমাণে কিছু দুধ নিয়ে নিন। ২-৩ চা চামচ হলেই যথেষ্ট। অন্য একটি বাটিতে অল্প পরিমানে চিনি ঢেলে নিন। একটি পরিষ্কার তুলোর বল সেই দুধে ভালোভাবে ভিজিয়ে নিন।তারপর সেই বল চিনির বাটিতে একবার চুবিয়ে নিন। তারপর সেই তুলোর বল আপনার পরিষ্কার ত্বকে আলতো করে ম্যাসাজ করতে থাকুন।

ম্যাসাজ করার সময় খেয়াল করবেন কখনোই খুব জোরে জোরে তুলোর বল ত্বকে ঘষবেন না। খুব আলতো করে ম্যাসাজ করা শেষ হয়ে গেলে ২-৩ মিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ভালো ভাবে ধুয়ে নিন। এভাবে সপ্তাহে ১ বার এই স্ক্রাব ব্যবহার করলেও অনেক ভালো ফলাফল পাবেন।

• ত্বকের দাগ দূর করতে দুধের ব্যবহার

আমাদের ত্বকে নানা কারণে নানা দাগ হয়ে থাকে। আমরা জানি যে আলুতে এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা কালো দাগ দূর করতে সহায়তা করে। অপরদিকে দুধ ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে। তাই ত্বকের দাগ দূর করতে আলু এবং দুধের একটি ফেইসপ্যাক অনেক কার্যকরী।

আরো পড়ুনঃ বডি স্ক্রাব ব্যবহারের নিয়ম, ফেস মাস্ক ব্যবহারের নিয়ম – How to use face mask, ঘাড়ের কালো দাগ দূর করার উপায়ঃ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

আলু এবং দুধের ফেসপ্যাক বানানো এবং ব্যবহার এর প্রক্রিয়া

প্রথমেই একটি পাত্রে অর্ধেক আলু আলু গ্রেট করে আলু গুলো ভালোভাবে ধুয়ে তা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিন। একটি পরিষ্কার কাপড়ের ছাকনির মাধ্যমে ব্লেন্ড করা আলু গুলো থেকে রস বের করে নিন। সেই রসে ৪-৫ চা চামচ দুধ মিশিয়ে নিন। আপনার যদি মনেহয় দুধের পরিমাণ আরো বেশি বাড়ানো প্রয়োজন সে ক্ষেত্রে আপনি আরো বেশি পরিমাণে দুধ ব্যবহার করতে পারেন। এবং চাইলে এর সাথে ১-২ চা চামচ মধু ও ব্যবহার করতে পারেন।

প্রথমেই আপনার ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিন। আপনার ত্বকের যেসব জায়গায় কালো দাগ রয়েছে সেসব জায়গায় অল্প অল্প করে এই মিশ্রণটি দিতে থাকুন। মিশ্রণ টি ত্বকে ব্যবহার করা শেষ হয়ে গেলে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। সম্পূর্ণ ফেইসে এই প্যাক ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।শুধুমাত্র স্পট গুলোতেই ব্যবহার করুন।এভাবে সপ্তাহে ৩-৪ বার করে এই প্যাকটি ব্যবহার করতে পারেন ১-২ মাস পর্যন্ত।

• ফেসিয়াল ক্লিনজার হিসেবে দুধ

ফেসিয়ালের জন্য বাজারে অনেক কিট পাওয়া যায়। সেইগুলো বেশিরভাগই ক্যামিকেল সমৃদ্ধ হয়ে থাকে। তাই ফেসিয়ালের শুরুতেই অল্প দুধে তুলো ভিজিয়ে সেই তুলোর বল দিয়ে আপনার পুরো মুখ একবার ম্যাসাজ করে কিছুক্ষণ রেখে দিন। এরপর ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ভালো করে ধুয়ে নিন।

নিয়মিত এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ত্বকে উজ্জ্বলতা বাড়ে। কিন্তু কেউ যদি তৈলাক্ত ত্বক এর হয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে দুধ ডিরেক্ট আপনার ত্বকের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। তাই ব্যবহার এর পূর্বে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করে নিবেন।

• ত্বকের আদ্রতা বাড়াতে দুধের তৈরি ফেইসপ্যাক

যাদের ত্বক অনেকটাই রুক্ষ তাদের জন্য দুধের সাথে পাকা কলা এবং মধু মিশিয়ে বানানো ফেইসপ্যাক অনেক ভালো কাজ করে। দুধ এবং মধু ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। কলা ত্বকের আদ্রতা বাড়িয়ে ত্বকের রুক্ষ ভাব কমাতে সাহায্য করে।

ফেইসপ্যাক বানানোর নিয়ম

আপনার মুখের আকৃতি অনুযায়ী অর্ধেক পরিমাণ কলা বা ছোট হলে একটি সম্পূর্ণ কলা স্লাইস করে কেটে নিন। স্লাইস করা কলা গুলো ভালো করে ব্লেন্ড করে নিন। চাইলে হাতে পিষে নিতে পারেন। এতে পরিমাণমতো দুধ এবং ১ থেকে ২ চা চামচ মধু মিশিয়ে নিন। ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার করে এই প্যাকটি ব্যবহার করুন। প্যাকটি শুকিয়ে গেলে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিন এবং আপনার পছন্দের মশ্চোরাইজার ব্যবহার করুন। সপ্তাহে ১-২ বার এই ফেইসপ্যাকটি ব্যবহার করুন।

আরো পড়ুনঃ এন্টি এজিং ফেসপ্যাকঃ বয়সের তুলনায় নিজেকে তরুণ দেখান, ফেস সিরাম ব্যবহারের নিয়ম এবং উপকারিতা, টক দই দিয়ে ফর্সা ও উজ্জ্বল ত্বক পেতে ৫টি ফেসপ্যাক

দুধ দিয়ে চুলের যত্ন নেয়ার নিয়ম

• ডিপ কন্ডিশনার হিসেবে দুধের ব্যবহার

অনেক সময় বাজারের নানা ক্যামিকেল জাতীয় প্রোডাক্ট ব্যবহার করার কারণে আমাদের চুল এবং আমাদের মাথার ত্বক অনেক রুক্ষ হয়ে যায়। এই রুক্ষ ভাব কাটিয়ে চুলকে উজ্জ্বল এবং ঝলমলে করতে দুধের ভূমিকা অপরিসীম।

শুধুমাত্র কাঁচা দুধ ৩০ মিনিট মাথার ত্বকে ভালোভাবে ম্যাসাজ করে রেখে দিন। তারপর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিন। আপনি যদি অর্গানিক শ্যাম্পু ব্যবহার করতে পারেন তাহলে অনেক উপকৃত হবেন। এছাড়াও দুধের তৈরি একটি হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।

দুধের তৈরি হেয়ারমাস্ক বানানো এবং ব্যবহারের নিয়ম

একটি বাটিতে পরিমাণ মতো দুধ নিয়ে নিন। যার চুল যতো বেশি তার তত বেশি দুধের প্রয়োজন হবে। এতে পরিমাণ মতো টকদই মিশিয়ে নিন। ভালো ভাবে মিক্স করে চুলের গোড়ায় ব্যবহার করুন। এবং অবশিষ্ট অংশ সম্পূর্ণ চুলে ব্যবহার করে ৩০-৪০ মিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিন। এই হেয়ারমাস্ক নিয়মিত ব্যবহার এ চুল ঝলমলে উজ্জ্বল হয় এবং চুলের রুক্ষ ভাব কেটে যায়।

• চুল ঝলমলে উজ্জ্বল এবং স্মুথ করতে দুধ এবং কলার তৈরি হেয়ার মাস্ক

একটি সম্পূর্ণ কলা ছোট ছোট স্লাইস করে কেটে ভালোমতো ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিন। এতে আধা কাপ পরিমাণে কাচা দুধ মিক্স করুন।

মিশ্রণ টি খুব একটা স্মুথ না হলেও চলবে। আপনার হাতের আঙ্গুল ব্যবহার করে হেয়ার মাস্ক টি মাথার ত্বক থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ চুলে ভালো ভাবে ব্যবহার করুন। ৩০-৪০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।

মাস্কটি শুকিয়ে গেলে তা আপনার চুলের সাথে খানিকটা শক্ত ভাবে এটে যেতে পারে। এতে আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। পরিষ্কার ঠান্ডা পানি দিয়ে ম্যাসাজ করে করে আস্তে আস্তে হেয়ার মাস্ক টি পরিষ্কার করে নিন। আপনার কাছে দুধের গন্ধ খুব একটা অস্বস্তিকর না হলে সেদিনই শ্যাম্পু করা থেকে বিরত থাকুন। পরদিন শ্যাম্পু করে নিতে পারেন।

আরো পড়ুনঃ চুল পড়া বন্ধ করার উপায়- ১৯টি সহজ টিপস, চুলে তেল দেয়ার সঠিক নিয়ম – How To Apply Hair Oil, 8 টি খাবার যা চুল পড়ার কারণ

দুধে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। নিয়মিত দুধ খেলে খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা নানা পরিবর্তন লক্ষ্য করে থাকি। কিন্তু কখনো কখনো দুধ অনেকেরই এলার্জি বা অন্যান্য নানা সমস্যার কারণ হয়ে থাকে সঠিক নিয়ম মেনে না খেলে।

ত্বক বা চুল আমাদের শরীরেরই একটি অংশ। শরীরের ভিতরের নানা উপকার করার পাশাপাশি এই প্রাকৃতিক উপাদানটি শরীরের উপরকার ত্বক এবং চুলের ও নানা উপকার করে থাকে।

এর জন্য প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান আর নিয়মিত এর ব্যবহার সম্পর্কে জানা। আর এই জন্যই আমাদের আজকের এই পোস্ট। আশা করি এই পোস্ট এর মাধ্যমে অনেকেই উপকৃত হতে পারবেন।

5/5 - (16 Reviews)
Subna Islam
Subna Islam
Articles: 36

Leave a Reply

Your email address will not be published.