তরমুজের ১৮ টি গুনাগুন

৩৭৫ বছর আগের কথা। বর্তমান ভারতের পূর্ব রাজস্থান শহরের এক জায়গায় হাজার হাজার সৈনিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তখন রাজস্থানের বিকানেরের সিলভা গ্রাম এবং নাগৌরের জখানি গ্রাম একে অপরের সঙ্গে সংলগ্ন ছিল। এই দুই গ্রামের মধ্যে সংঘটিত হওয়া যুদ্ধে নিহত হয়েছেন তারা।

কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যপার হল। যুদ্ধটা কোন রাজ্য দখল কিংবা অন্য প্রতিপত্তি লাভের আশায় নয় যুদ্ধটা হয়েছিল “ফলের” কারণে। এই যুদ্ধের নাম ” মাতিরে কি রাড় “। রাজস্থানি ভাষায় মাতিরে মানে তরমুজ। জ্বি, ঠিক ধরেছেন। এই তরমুজের জন্যেই সংঘটিত হয়ছিল যুদ্ধটি। যা ইতিহাসে একমাত্র ও বিরল। 

যে তরমুজ নিয়ে একটা যুদ্ধও পর্যন্ত হয়ে গেছে, সেই তরমুজে কি এমন আছে চলুন তা জেনে নেওয়া যাক। 

তরমুজ গ্রীষ্মকালীন সুস্বাদু ফল। রসালো ও মিষ্টি এই ফলটি বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। তরমুজ শুধু সুস্বাদু নয় পুষ্টিগুণেও ভরপুর।

প্রতি ১০০ গ্রাম তরমুজে রয়েছে, 

শক্তি১২৭ কিজু (৩০ kcal)
শর্করা7.55 g
চিনি6.2 g
খাদ্যে ফাইবার0.4 g
স্নেহ পদার্থ0.15 g
প্রোটিন 0.61 g

303 μgথায়ামিন (বি১)
0.033 mgরিবোফ্লাভিন (বি২)
0.021 mgন্যায়েসেন (বি৪)
0.178 mg প্যানটোথেনিক অ্যাসিড (বি৫)
0.221 mg ভিটামিন বি৬
0.045 mg কোলিন
4.1 mg ভিটামিন সি
8.1 mg ধাতুসমুহক্যালসিয়াম
7 mg লোহা
0.24 mg ম্যাগনেসিয়াম
10 mg ম্যাঙ্গানিজ
0.038 mg ফসফরাস
11 mg পটাশিয়াম
112 mg সোডিয়াম
1 mg দস্তা

এই গরমে যে কারও পছন্দের শীর্ষেই থাকে তরমুজ।গরমে তরমুজ শরীরে পানির ঘাটতিও পূরণ করে।তরমুজের শরবত কাজ করে প্রাণ জুড়ানো, যা শরীর মন দুইটায় ঠান্ডা করে।

যা জানলে তরমুজ কিনে আর ঠকবেন না

 প্রায়ই এমন হয় যে বাইরে থেকে বেশ সুন্দর দেখতে তরমুজ কাটলে দেখা যায় ভেতরে পঁচা কিংবা অর্ধেক কাঁচা।  

কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দেখে ভাল তরমুজ চেনা যায়

১. শব্দঃ তরমুজ কেনার আগে তরমুজের গায়ে টোকা দিয়ে শব্দ শুনতে হবে, যদি ড্যাবড্যাব শব্দ হয় । তাহলে বুঝতে হবে তরমুজটি পাকা। 
২.তরমুজের রংঃতরমুজের গায়ের রঙ টিয়া হলে কাঁচা আর যদি একটু ফর্সা হয় তখন বুঝবেন তরমুজটি পাঁকা। 
৩.চাপঃ তরমুজে চাপ দিয়ে শক্ত মনে হলে সেটা ভাল, কিন্তু নরম হলে সেটা পঁচা। 
৪. বোঁটাঃ তরমুজের বোঁটা শুকনো থাকলে বুঝবেন তরমুজটি পাঁকা, বোঁটা টাটকা থাকলে বুঝতে হবে তরমুজটি এখনো কাঁচা। 
৫. ওজনঃ তরমুজ হাতে নিয়ে দেখুন, যদি ভারী মনে হয় তাহলে তরমুজটি ভাল। অন্যথায় হালকা মনে হলে বুঝতে হবে তরমুজটি ফাঁপা। 
৬.কালো দাগঃ তরমুজের গায়ে কালো থাকলে থাকলে টিপে দেখুন, যদি নরম হয় তবে বুঝবেন তরমুজটি পঁচা। 
৭.গন্ধঃ তরমুজের গন্ধ শুকে দেখুন ভাল তরমুজ হলে মিষ্টি ও পাঁকা গন্ধ পাবেন। 
৮.আকৃতিঃ যদি তরমুজ পুরো সমান হয় তাহলে বুঝবেন তরমুজটি পাঁকা। 

তরমুজের ১৮ টি গুনাগুন 

১. গর্ভবতী মহিলাদের জন্যঃ গর্ভবতী মহিলাদের বুকের জ্বালা ভাব দূর করতে তরমুজ বেশ উপকারি। এছাড়াও, সকালে উঠে অসস্তিবোধ হলে তরমুজ খেলে তা অনেকটা রোধ করা যায়, 

২.ফোলাভাব দূর করতেঃ তরমুজে রয়েছে লাইকোপেন। যা কোষ নষ্ট হওয়া আটকায় এবং শরীরের ফোলাভাব দূর করে। 

৩. শক্তি বাড়ায়ঃ তরমুজ যথেষ্ট পুষ্টি সমৃদ্ধ ফল যা শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে শরীর তরতাজা রাখে। 

৪. দাঁতের জন্যেঃ ভিটামিন সি এর অভাবে মাড়ি ফুলে যায় ও রক্তপাত হয়। তরমুজ ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ। যা মাড়ির জন্য উপকারি।

৫. স্ট্রোক আটকাতেঃ তরমুজে প্রায় ৯২% পানীয় থাকে। তাই প্রচন্ড গরমে শরীরের পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে হিটস্ট্রোক আটকায় তরমুজ। 

৬. হাড়ের জন্যঃ তরমুজে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন-সি। যা অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের চিড় ধরা রোধ করে ও হাড় বৃদ্ধি করে। 

৭.চোখের জন্যঃ তরমুজে রয়েছে ভিটামিন-এ। ভিটামিন-এ দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে, ও বয়স্ক কালে দ্রুত সানি পড়া রোধ করে। 

৮. ডায়াবেটিসের জন্যঃ তরমুজে রয়েছে এন্টি-ডায়াবেটিক উপাদান। তাছাড়া তরমুজ কম শর্করা বিশিষ্ট ফল। তাই এটি ডায়াবেটিস হওয়া থেকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে। 

৯.কিডনির সুরক্ষাঃতরমুজে পটাশিয়ামের মাত্রা খুব কম। কিডনির রোগীদের কম পটাশিয়াম যুক্ত খাবার খাওয়া উচিত। তাদের খাবার তালিকায় তরমুজ থাকা বেশ উপকারি। 

১০. উচ্চরক্তচাপ কমাতে তরমুজঃ তরমুজে রয়েছে সিট্রোলিন। যা রক্তচাপ কমিয়ে আনতে দারুন কার্যকরী। 

১১.হার্টের জন্যঃ তরমুজ নিষ্প্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল দূরে রেখে হার্টকে সুস্থ ও সবল রাখে। এছাড়াও তরমুজে থাকা সিট্রোলিন মহিলাদের ধমনির ব্যথা রোধ করে। 

১২. হজম ক্ষমতা বাড়ায়ঃ। তরমুজে রয়েছে প্রায় ৯২ শতাংশ জল। যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ও খাবার হজম করে পেট পরিষ্কার রাখে। 

১৩. শরীর ঠান্ডা রাখতেঃ তরমুজে পর্যাপ্ত পানি থাকে যা শরীরকে আর্দ্র রাখে ও কিডনীকে সতেজ রাখে। 

১৪.ওজন কমাতে তরমুজঃ 

তরমুজের সবথেকে বড় উপকারিতা হল এটি ওজন কমানোর জন্যে কার্যকরী জানা যায় কারণ তরমুজে জলের পরিমান খুবই উচ্চ। এর ফলে বিপাক ক্রিয়া সঠিক থাকে ও শরীরকে নানা ধরণের বিষক্রিয়া পদার্থ ও ফ্যাট থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে, যা ওজন হ্রাস করতে সাহায্য করে ।

একটি তরমুজের বড় টুকরোয় মাত্র ৮৬ ক্যালোরি , ২২ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট ও ১ গ্রামের থেকেও কম ফ্যাট থাকে এবং কোনোরকম কোলেস্টেরল থাকে না। এটি আপনার শরীরের প্রতিদিনের  ফাইবারের প্রয়োজনীয়তাকে ৫% মেটায় যা শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাট কমাতে সাহায্য করে।

১৫. ক্যান্সার রুখতে তরমুজঃ তরমুজে রয়েছে লাইকোপেন। এই লাইকোপেনের কারণে তরমুজের ভেতরে লাল হয়। এই লাল হওয়া অংশ যা আমরা খেয়ে থাকি তা এন্টি অক্সিডেন্টে ভরপুর যা ক্যান্সার রোধ করে। তাছাড়া প্রোস্টেট ক্যান্সারের জন্যে লাইকোপেন কেমো থেরাপির মত কাজ করে। 

১৬.হাঁপানির জন্যঃ তরমুজে থাকা লাইকোপেন শরীরের জ্বর, শর্দি,ঠান্ডা লাগা রোধ করে হাঁপানির ঝুকি কমায়। 

১৭.রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিঃ তরমুজে রয়েছে ভিটামিন সি যা প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।এছাড়াও তরমুজে থাকা ভিটামিন -বি৬ এন্টি বডি তৈরি করে শরীরকে বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করে। 

১৮. মাংস পেশির জন্যঃ

ব্যায়াম বা জিম করার পর মাংস পেশীতে যখন ব্যাথা করে তখন ইলেকট্রোলাইট ও অ্যামাইনো অ্যাসিড ভরপুর সিট্রোলিন ( l-Citrulline) আরামদায়ক একটি ঔষধির কাজ করে। যা মাংসপেশিকে সচল ও সবল রাখে।

অপকারিতা

☠️ অনেকের তরমুজ খেলে শরীরে লালচে দাগ, চুলকানি হয়। এটা এক ধরনের এলার্জি। তাই যাদের ক্ষেত্রে এমন হয় তাদের ক্ষেত্রে না খাওয়াই ভাল, 

☠️হাইপারক্যালেমিয়া নামক একধরনের রোগ আছে, যা এমন একটি রোগ যেখানে শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক মাত্রায় পটাশিয়াম বেড়ে যায়,  । এর ফলে হার্টের সমস্যা যেমন অনিয়মিত হৃদস্পন্দন ও দুর্বল নাড়ি, ইত্যাদি সমস্যা হয়। অধিক পরিমানে তরমুজ খেলে এরকম হতে পারে। 

☠️ তরমুজে থাকা লাইকোপেন অতিরিক্ত পরিমাণে শরীরে প্রবেশ করলে পেট খারাপ, বমি এমনকি পাতলা পায়খানাও হতে পারে। 

তবে সে যাই হোক,তরমুজের এতো গুনাবলির মধ্যে এই সাবধানতা নস্যি। তাই প্রয়োজন ও পরিমাণমত প্রতিদিন খাবার তালিকায় তরমুজ রাখুন 

সুস্থ থাকুন।

Rate this post

Leave a Reply

Your email address will not be published.