ফেস মাস্ক ব্যবহারের নিয়ম – How to use face mask

ত্বকের যত্নে যুগে যুগে নানা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার হয়ে আসছে। সেসব প্রাকৃতিক উপাদান এর উপর নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আধুনিক পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির এর মাধ্যমে বাজারে এসেছে নানা প্রসাধনী বা স্কিন কেয়ার আইটেম। বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এসব প্রসাধনী বা স্কিন কেয়ার আইটেম ত্বকের নানা সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম।

এসব প্রসাধনীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফেস মাস্ক যা ত্বকের ধরন অনুযায়ী ত্বকের নানা সমস্যার সমাধান করতে পারে। একেক টি ফেসমাস্ক একেক একেক রকমে ব্যবহার করতে হয়।
আজকে আমরা ভিন্ন ভিন্ন সেসব ফেস মাস্ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে আপনাদের জানবো যা ত্বকের নানা সমস্যায় ব্যবহার করা যায়।

অর্গানিক ফেসপ্যাক বা ফেসমাস্ক

অর্গানিক ফেস মাস্ক বলতে এমন কিছু ফেস মাস্ক বুঝানো হয় যা প্রাকৃতিক নানা উপাদান থেকে তৈরি। যেমন, মুলতানি মাটির ফেইসপ্যাক, চালের গুড়া, মেথির গুড়ো, আলুর গুড়ো, চন্দন গুড়ো, কলার খোসা, পেঁপের খোসা ইত্যাদি নানা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে অনেক ফেইস মাস্ক তৈরি করা হয়। যা বাজারে প্যাকেটজাত হিসেবে বিক্রি হয়।

এর পাশাপাশি বাজার থেকে একদম অর্গানিক এসব উপাদান র এলিমেন্ট আকারে কিনেও মানুষ ব্যবহার করে আসছে। এসব উপাদান এর সাথে আরো দু একটি উপাদান মিক্স করে একটি নতুন ফেস মাস্ক ও বানিয়ে নেয়া সম্ভব।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

অর্গানিক ফেসমাস্ক ব্যবহারের পূর্বে আপনার জেনে নেওয়া প্রয়োজন আপনার স্কিন টাইপ কি এবং কোন উপাদান গুলো আপনার স্কিনে বেশি মানানসই। এর পাশাপাশি আপনি যে মাস্ক টি কিনতে চাচ্ছেন বা যে র এলিমেন্ট দিয়ে আপনি আপনার স্কিন কেয়ার করতে চাচ্ছেন সেসব মাস্ক কি কি উপাদান দ্বারা তৈরি এবং সেসব উপাদান এ আপনার কোনো প্রকার এলার্জি আছে কিনা সেটাও খেয়াল করে নিতে হবে।

যেকোনো ফেইসপ্যাক বা ফেসমাস্ক ব্যবহার এর আগে ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিবেন। আপনি চাইলে আপনার পছন্দের ফেইসওয়াস ব্যবহার করে ত্বক পরিষ্কার করে এরপর ফেসপ্যাক ব্যবহার করতে পারেন।

অনেক সময় পন্যের প্যাকেট এ এর ব্যবহার বিধি লিখে দেওয়া থাকে। সেই উপায় অনুসরণ করে ফেসপ্যাক টি খুলে, কোনো পরিস্কার বাটিতে ভালোভাবে মিক্স করে ব্যবহার করুন। আর যদি কোনো র এলিমেন্ট হয়ে থাকে, তবে সেসব উপাদান এর সাথে আর কি কি উপাদান মিক্স করতে হবে তা ভালোভাবে জেনে তবেই ব্যবহার করুন। ফেসপ্যাক বা ফেসমাস্ক ব্যবহার এর আগে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করে নিবেন।

আরো পড়ুনঃ প্রতিদিন মুখে টমেটো লাগানোর উপকারিতা, ত্বকের জন্য পেঁপের উপকারিতা এবং কীভাবে ব্যবহার করবেন, রূপচর্চায় কলার খোসার ব্যবহার

এক্সফোলিয়েটিং মাস্ক বা স্ক্রাব

এসব মাস্ক ত্বকের ওপেন পোরস বা গর্ত ভালোভাবে পরিষ্কার করে ত্বককে ভিতর থেকে ক্লিন করে। এগুলো নানা ফর্মুলায় থাকতে পারে। কখনো কখনো এগুলো জেল ফর্মুলায় ও থাকে। আবার কখনো এর ভিতরে বিটস বা যে উপাদান দ্বারা এই মাস্ক টি তৈরি তার ছোট ছোট দানাদার কিছু উপাদান থাকে। এসব উপাদান ত্বকের ভিতর এ যেয়ে ত্বকের ভিতরে জমে থাকা ময়লা দূর করতে সাহায্য করে।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

যাদের ত্বকে অনেক বেশি ব্রণ হয় অথবা অনেক সেনসিটিভ তারা স্ক্রাব ব্যবহার এর পূর্বে কোনো চিকিৎসক বা অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নিয়ে তবেই ব্যবহার করবেন। রাতে এসব মাস্ক ব্যবহার করা উত্তম।

ত্বকে স্ক্রাব লাগানোর পর তা কিছুক্ষণ রেখে আলতো করে ম্যাসাজ করুন। এরপর একটি ফেইসপ্যাক ব্যবহার করলে অনেক উপকার পাওয়া যায়। বিশেষ ভাবে পোরস টাইট করতে পারে এরকম কোনো ফেসপ্যাক ব্যবহার করা উচিৎ। সপ্তাহে ১-২ বার স্ক্রাব ব্যবহার করবেন। অধিক মাত্রায় ব্যবহার এ লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি থাকে।

আরো পড়ুনঃ বডি স্ক্রাব ব্যবহারের নিয়ম, ঘাড়ের কালো দাগ দূর করার উপায়ঃ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

ক্লে মাস্ক

ক্লে মাস্ক হলো এমন এক ধরনের মাস্ক যা অর্গানিক কোনো মাটি বা উপাদান থেকে বানানো হয়।এটি স্কিন এ অনেক সুন্দর ভাবে মিক্স হয়ে যায় এবং খুব জলদি শুকিয়ে যায়। এর মাস্ক মাড মাস্ক নামেও পরিচিত।

তৈলাক্ত ত্বক এর জন্য এই মাস্ক অধিক কার্যকরী। শুষ্ক বা অধিক ব্রণ যুক্ত স্কিন এর জন্য এই মাস্ক পরিক্ষা না করে ব্যবহার করা উচিৎ নয়।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

মাস্ক টি যদি কোনো প্যাকেট বা টিউব এ থাকে তাহলে একটি পরিষ্কার পাত্রে তা ঢেলে নিন। তাতে প্রয়োজন মতো পানি বা গোলাপ জল মিশিয়ে নাড়তে থাকুন যতক্ষণ না পর্যন্ত সুন্দর পেস্ট এ পরিনত না হচ্ছে। পেস্ট হয়ে গেলে তা একটি পরিষ্কার ব্রাশ এর সাহায্যে সম্পুর্ন ত্বকে লাগিয়ে ফেলুন।

অন্যান্য মাস্ক এর মতো ক্লে মাস্ক ব্যবহার এর পূর্বে ও অবশ্যই মুখমণ্ডল ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিবেন। প্যাকটি শুকিয়ে গেলে পানি দিয়ে ধুয়ে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করে নিন।

আরো পড়ুনঃ লেবু দিয়ে ফর্সা হওয়ার উপায়, এলোভেরা দিয়ে ফর্সা হওয়ার উপায়, মুলতানি মাটি দিয়ে ফর্সা হওয়ার উপায়, ব্রণের উপর নারিকেল তেল: এটি ভাল না খারাপ?

পিল অফ মাস্ক

পিল অফ মাস্ক এক প্রকার আঠালো পদার্থ দ্বারা তৈরি একটি মাস্ক। বিভিন্ন প্রকার ফলের নির্যাস থেকে এসব মাস্ক তৈরি করা হয়। ত্বকের লোমকূপ পরিষ্কার, ব্ল্যাকহেডস হোয়াইট হেডস দূর করার জন্য এই মাস্ক ব্যবহার করা হয়।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

পিল অফ মাস্ক ব্যবহার এর কিছুক্ষণ এর মধ্যেই দেখবেন এর আঠালো অংশ আপনার ত্বকের সাথে একদম মিশে গেছে।

ব্যবহারের সময় অবশ্যই চোখের চারপাশ টা এভোয়েড করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রাখার পর আস্তে আস্তে ত্বক থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করুন। টেনে তোলার সময় অবশ্যই নিচ থেকে উপরের দিকে টান দিবেন।

কখনোই এসব মাস্ক ম্যাসেজ করে বা ত্বকের উপর থেকে নিচের দিকে টেনে উঠানো উচিত নয়। এই মাস্ক ব্যবহার এর পর ত্বক অনেকটাই ফর্সা এবং পরিষ্কার দেখায়। সপ্তাহে ১-২ বার এই মাস্ক ব্যবহার করা যাবে।

আরো পড়ুনঃ হোয়াইটহেডসের কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিকারের ঘরোয়া উপায়, ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির খাবার তালিকাঃ কমপ্লিট ডায়েট প্ল্যান, মুখের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির উপায় 15 টি ঘরোয়া প্রতিকার

জেল বেসড মাস্ক

জেল বেসড মাস্ক নরম এবং জেল ফর্মুলায় থাকে। এগুলো শুষ্ক ত্বকের জন্য সবচেয়ে ভালো হয়ে থাকে। এই মাস্ক নানা ফলের নির্যাস একসাথে মিক্স করে তৈরি করা হয়। এটি ত্বক ফর্সা করে এবং ফ্রেশ করে তোলে।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

জেল বেসড মাস্ক ব্যবহার এর পূর্বে অবশ্যই ত্বক ভালো ভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। ত্বক শুকিয়ে তারপর মাস্ক টি ব্যবহার করুন। ১৫-২০ মিনিট রেখে দিলে এই মাস্ক খুব সুন্দর ভাবেই ত্বকের সাথে মিশে যায়।

তারপর পানি দিয়ে হালকা ম্যাসাজ করে মাস্ক টি পরিষ্কার করে ফেলুন। এই মাস্ক ত্বককে অনেক ময়শ্চারাইজ করে তোলে। তাই ড্রাই স্কিন এর জন্য এটি বেশি কার্যকরী। এছাড়া অন্যান্য স্কিন টাইপ এ ও এই মাস্ক ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু এর আগে প্যাচ টেস্ট করে নিতে হবে।

স্লিপিং মাস্ক

স্লিপিং মাস্ক পিল অফ মাস্ক এর একদম বিপরীত ভূমিকা পালন করে। এই মাস্ক ব্যবহার করে আপনি ঘুমিয়ে থাকবেন। ঝটপট ধুয়ে ফেলার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। এগুলো ও অনেকটাই জেল বেসড ফর্মুলায় হয়ে থাকে। এই মাস্ক ব্যবহার করে ঘুমাতে গেলে সেই রাতের জন্য বাকি স্কিন কেয়ার গুলো স্কিপ করে নিবেন।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

ত্বককে আর্দ্র, নমনীয়, কোমল এবং ঝলমলে রাখার জন্য এই মাস্ক এর জুড়ি নেই। স্লিপিং মাস্ক ব্যবহার এর আগে ত্বক ভালো ভাবে ওয়াশ করে ড্রাই করে নিতে হবে। চাইলে আপনি টোনার ব্যবহার করতে পারেন। ত্বকের সাথে টোনার ভালো ভাবে মিশে গেলে এর উপর স্লিপিং মাস্ক ব্যবহার করে ঘুমিয়ে পড়ুন। এই মাস্ক যেকোনো স্কিন টাইপ এর মানুষ ই ব্যবহার করতে পারেন।

আরো পড়ুনঃ ফেস সিরাম ব্যবহারের নিয়ম এবং উপকারিতা, আরগান তেল: ত্বকের সমস্যাগুলোর জন্য গোপন অস্ত্র

শিট মাস্ক

শীট মাস্ক পাতলা পর্দার মতো বা পাতলা কাজগের একটি মাস্ক যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে সিরাম লাগানো থাকে। এই মাস্কটি ও নানা ফলের নির্যাস থেকে তৈরি করা হয় এবং এটি প্যাকেটজাত অবস্থায় থাকে। এর আকৃতি আপনার মুখমণ্ডল এর সমান হয়ে থাকে। চোখ, নাকের ছিদ্র এবং ঠোঁটের অংশ গুলোয় ফাকা রেখে সম্পূর্ণ মুখের আকৃতিতে এই মাস্ক বানানো হয়ে থাকে।

এই মাস্ক নানা কারনে ব্যবহার হয়ে থাকে। ত্বকের আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ত্বকের ব্রণ দূর করে ভিতর থেকে পরিষ্কার করে অত্যন্ত ঝলমলে এবং চকচকে করে তুলতে পারে শিট মাস্ক। বাংলাদেশ এর মতো জায়গায় এর দাম কিছুটা বেশি। কিন্তু সপ্তাহে একবার করে হলেও এই মাস্ক ব্যবহার এ ত্বকে অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

কিভাবে ব্যবহার করবেন?

শিট মাস্ক ব্যবহার এর আগে এর প্যাকেট এ লিখা ব্যবহারবিধি, নির্দেশনা এবং সময় ভালো ভাবে জেনে নিবেন। প্যাকেট টি উপর থেকে সোজা করে কাচি দিয়ে কেটে ভিতর থেকে মাস্কটি বের করে নিবেন। যেহেতু মাস্ক টিতে প্রচুর পরিমাণে সিরাম থাকে তাই এটি ব্যবহার খানিকটা ম্যাসি হতে পারে।

মাস্ক টি ধীরে ধীরে খুলে আপনার মুখমণ্ডল এর পজিশন অনুসারে সুন্দর ভাবে লাগিয়ে নিন। বাকি সিরাম গুলো চাইলে আপনি হাতে বা গলায় ব্যবহার করে নিতে পারেন। আবার চাইলে পরিবর্তিতে ব্যবহার এর জন্য ফ্রিজে স্টোর করে রাখতে পারেন।

কিন্তু শিট মাস্ক টি শুধুমাত্র একবারই ব্যবহার করা যাবে। ত্বকে ওভার নাইট উজ্জ্বলতা আনার জন্য এই মাস্ক এর তুলনা হয় না।

ত্বকের যত্নে আপনি যেকোনো মাস্কই ব্যবহার করুন না কেনো এর আগে একবার প্যাচ টেস্ট করে নেয়া অনেক জরুরি। ত্বকের ধরন জেনে তবেই ফেইসমাস্ক কিনা উচিৎ। এই মাস্ক ত্বকের নানা ক্ষতি সাধন ও করতে পারে যদি আপনি স্কিন টাইপ বুঝে না কিনে থাকেন।

তাই মাস্ক এর প্যাকেট এর গায়ে লিখা নির্দেশাবলি দেখে তবেই মাস্ক কিনুন। এবং সঠিক উপায়ে ফেস মাস্ক ব্যবহারের নিয়ম গুলো জেনে তবেই মাস্ক ব্যবহার করুন।

আরো পড়ুনঃ

5/5 - (12 Reviews)
Subna Islam
Subna Islam
Articles: 36

Leave a Reply

Your email address will not be published.