দারুচিনি খাওয়ার নিয়ম

দারুচিনি খাওয়ার নিয়ম জানতে পারবেন আজকের পোস্টে। আমরা আলোচনা করেছি বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পেতে দারুচিনি কিভাবে খাবেন সে বিষয়ে।

দারুচিনিকে বলা হয় মশলার রানী। দারুচিনি মশলা হিসেবে খুবই পরিচিত। কিন্ত দারুচিনি শুধু মশলাই নয়, এর বেশি কিছু। উপমহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কিছু দেশে ঝালজাতীয় খাবারে এর ব্যবহার হয়ে থাকে। তবে ইউরোপ ও আমেরিকায় বিভিন্ন মিষ্টি খাবারের স্বাদে ভিন্নমাত্রা আনতে দারুচিনির বেশি ব্যবহার দেখা যায়।বর্তমানে দারুচিনি চা তেও ব্যবহৃত হয়।

দারুচিনি চা একটি আকর্ষণীয় পানীয় যা বিভিন্ন স্বাস্থ্য বেনিফিট সরবরাহ করে। দারুচিনি আপনার শরীরের মেদ কমাতে সহায়তা করে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো ত্বকের কোষের প্রাকৃতিক বার্ধক্য প্রক্রিয়াটি ধীর করে দেয় এবং ফ্রি র‍্যাডিকেল এর প্রভাব হ্রাস করে। এই অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলো ফ্যাট জমে যাওয়া রোধ করে হৃদরোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই প্রতিবেদনে দারুচিনি খাওয়ার নিয়ম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

আগের পোস্টে দারুচিনির উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। আগের পোস্টটি অবশ্যই পড়ে নিবেন।

দারুচিনি খাওয়ার নিয়ম

দারুচিনির উপকারিতা ও অপকারিতা

সর্দি নিরাময়েঃ দারুচিনি চা গলা, সর্দি নিরাময়ে সাহায্য করে। এর কারণ দারুচিনিতে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ঠাণ্ডা, কাশি বা গলার সমস্যায় দারুচিনি খুবই কার্যকরী ওষুধ হিসেবে কাজ করে। এক চামচ মধু ও এক চিমটে দারুচিনি পিষে মিশিয়ে খেলে ঠান্ডায় আরাম পাওয়া যায়।

দারুচিনির গুঁড়া মধুর সঙ্গে গরম বা হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে পান করতে পারেন। দারুচিনির গুঁড়া কালো গোলমরিচের সঙ্গে খেলেও আরাম পাওয়া যায়। এটি পুরানো কফেও আরাম দেবে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়ঃ দারুচিনিতে প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে যা ভাইরাস, ছত্রাক এবং এন্টিসেপটিক বৈশিষ্ট্যগুলো রোগ প্রতিরোধ করে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে এবং বিভিন্ন ধরণের রোগ থেকে শরীরকে রক্ষা করে।

স্মৃতিশক্তিঃ নিয়মিত দারুচিনি চা খেলে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। শারীরিক উপকারের পাশাপাশি দারুচিনি স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও সহায়ক। পানিতে দারুচিনি ঘষে মাথার ত্বকে গরম পেস্ট লাগালে আরাম পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, নিয়মিত মধু ও দারুচিনি সেবন করলে মানসিক চাপ কমে যায় এবং স্মৃতিশক্তিও বৃদ্ধি পায়।

ডায়বেটিস প্রতিরোধঃ রক্তশর্করা বা ব্লাডসুগার নিয়ন্ত্রণের জন্য দারুচিনি বেশ উপকারী এবং আপনার শরীরে টাইপ টু ডায়বেটিস প্রতিরোধ করে। সকালের চায়ের কাপে কয়েকটি দারুচিনি ছড়িয়ে দিতে পারলে তা ভীষণ কাজ দেয়। আপনার শরীরের প্রয়োজনীয় এনজাইমগুলো চাঙ্গা করতে সাহায্য করে তার জেরে শরীরের কোষে ইনসুলিনের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ডায়বেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

ডায়বেটিস প্রতিরোধ করা মানেই আপনার হার্টের সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে। আবার ব্লাডসুগার নিয়ন্ত্রণে থাকা মানে আপনার হরমোন স্বাভাবিক কাজ করবে এবং আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে দেবে না। দারুচিনি সুগার নিয়ন্ত্রণ করে আপনার ক্লান্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কাও কমিয়ে দেয়।

আরো পড়ুনঃ ডায়াবেটিস কি, ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণগুলো, ঘরোয়া পদ্ধতিতে ডায়াবেটিস কমানোর উপায়

বদহজমেঃ বদহজমের কারণে পেটের ব্যথা, পেটের ব্যথা সহ মাথাব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া হতে পারে। দারুচিনি পেটের অ্যাসিড হ্রাস করে যা রিফ্লাক্স তৈরি করে এবং খাদ্য হজমে সাহায্য করে।

  • আপনার হজম ভালো না হলে দুধ এর সাথে দারুচিনি মিশিয়ে পান করা আপনার জন্য খুবই উপকারী হবে। এর পাশাপাশি এটি গ্যাসের সমস্যায় স্বস্তি দিতেও কাজ করে।
  • প্রতিদিন সকালে এক কাপ গরম পানি, দারুচিনি ও মধু মিশিয়ে পান করলে দীর্ঘস্থায়ী জয়েন্টের ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
  • রুটির সাথে দারুচিনি ও মধু মিশিয়ে খেলেও হৃদরোগ থেকে দূরে থাকতে পারেন।
  • দারুচিনি এক সপ্তাহের মধ্যে বাতের ব্যথা উপশম করে এবং এক মাস খেলে হাঁটতে অক্ষম মানুষ হাঁটতে সক্ষম হয়। বাতের ব্যথায়ও দারুচিনি খুবই উপকারী বলে প্রমাণিত হয়।

আরো পড়ুনঃ অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিক থেকে মুক্তির উপায়, বাত বা আর্থ্রাইটিস রোগের ঘরোয়া চিকিৎসা, দুধের উপকারিতা, মধু খাওয়ার নিয়ম

বমি ও ডায়রিয়াঃ বমি ও ডায়রিয়ার সমস্যায়ও এর সেবন উপকারী। এর পাশাপাশি এটি খাবার হজমেও ভালো কাজ করে। মধু এবং দারুচিনির গুঁড়ার মিশ্রণ গ্রহণ করলে পাকস্থলীর আলসার মূল থেকে নিরাময় হয়।

মাথাব্যথাঃ ঠাণ্ডা বাতাস বা ঠান্ডাজনিত মাথাব্যথায় দারুচিনির পেস্ট লাগালে উপকার পাওয়া যায়। গরমের কারণে মাথাব্যথা হলে চালের পানিতে দারচিনি ও তেজপাতা পিষে চিনি দিয়ে শুঁকে খেলে মাথাব্যথা দূর হয়। এছাড়া তিলের তেলের সঙ্গে কয়েক ফোঁটা দারুচিনির তেল মিশিয়ে মাথায় মালিশ করলেও মাথাব্যথা উপশম হয়।

ত্বক ও চুলঃ ত্বক ও চুলের সৌন্দর্যেও পিছিয়ে নেই দারুচিনি। ত্বককে উজ্জ্বল করার পাশাপাশি বলিরেখাও কমায়। লেবুর রসের সাথে দারুচিনির গুঁড়ো মিশিয়ে লাগালে ব্রণ ও ব্ল্যাকহেডস দূর হয়। একটি লেবুর রসে দুই টেবিল চামচ অলিভ অয়েল, এক কাপ চিনি, আধা কাপ দুধ, দুই চা চামচ দারুচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে শরীরে লাগিয়ে রাখুন ১৫ মিনিট। এর পর স্নান করুন, ত্বক সতেজ হয়ে উঠবে।

রাতে ঘুমানোর আগে মুখে মধু ও দারুচিনির পেস্ট লাগান এবং সকালে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে মুখ উজ্জ্বল হবেটাক পড়া বা চুল পড়ার সমস্যার জন্য গরম অলিভ অয়েলে এক চামচ মধু ও এক চামচ দারুচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে মাথায় লাগিয়ে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। দুই থেকে তিন সপ্তাহ এভাবে করলে চুল পড়া কমে যাবে।

প্রদাহ দূর করেঃ দারুচিনি তেল ব্যথা, ক্ষত এবং প্রদাহ দূর করতে ব্যবহৃত হয়। ত্বকের চুলকানি দূর করার পাশাপাশি এটি দাঁতের ব্যথায়ও আরাম দেয়। মুখে দারুচিনি চুষে নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধের সমস্যায় খুবই উপকারী প্রমাণিত হয়।

ওজন কমাতে দারুচিনির ব্যবহারঃ দারুচিনিতে রয়েছে দারুণ ভেষজ গুণ। বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, দারুচিনিতে রয়েছে বিভিন্ন অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং এন্টিবায়োটিক। দারুচিনি কার্যকরভাবে ইনসুলিনের কাজ করে। সে অর্থে এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশ উপকারী একটি মসলা।

দারুচিনি দেহের এলডিএল বা খারাপ কোলস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। দারুচিনি পাকস্থলীর ভেতরের খাবারের চলাচলকে ধীর করতে সাহায্য করে। এর ফলে যারা ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য এই এটি বেশ উপকারী। এই মসলাটি বিপাকক্রিয়াও পরিবর্তিত করতে পারে।

যার ফলে দেহ তার অতিরিক্ত শর্করাকে চর্বিতে পরিণত হতে না দিয়ে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়। তাই নিয়মিত এর নির্যাস পান করলে দেহের অতিরিক্ত চর্বি ধীরে ধীরে কমে যাবে। এ ক্ষেত্রে ঘুমানোর আগে দারুচিনির পানি খেলে উপকার পাওয়া যাবে বেশি।

মধু ও দারুচিনি খাওয়ার নিয়মঃ মধু ও দারুচিনি কমবেশি আমরা সবাই খেয়ে থাকি। তবে এর ঔষধি গুণের কথা আমরা অনেকেই জানি না। শীতকালে পুরো সময়জুড়ে গরম পানিতে মধু ও দারুচিনি গুঁড়া মিশিয়ে খেলে অনেক উপকার পাওয়া যায়। আর বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি মেলে।

সকালে নিয়মিত গরম পানিতে মধু ও দারুচিনি মিশিয়ে পান করলে অতিরিক্ত চর্বি কমবে। ফলে ওজন কমবে। দারুচিনির গুঁড়া আলাদাভাবে তলপেট ও কোমরের বাড়তি মেদ কমাতে কাজ করে।

দারুচিনি ও মধুতে থাকা একাধিক উপকারী উপাদান মুখ গহ্বরে ক্ষতিকর ও দুর্গন্ধ তৈরিকারী জীবাণু ধ্বংস করে। আর মুখে গন্ধ দূর হওয়ার সঙ্গে দাঁত ও মাড়ি সম্পর্কিত নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও কমে যায়।

মুখের ভেতরের এ উপকার পেতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৩-৪ দিন নিয়ম করে এক গ্লাস গরম পানিতে আধা চা চামচ দারুচিনি গুঁড়া ও এক চা চামচ মধু মিশিয়ে পান করতে হবে। ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএলের মাত্রা কমানোর মধ্য দিয়ে হৃদস্বাস্থ্যের উন্নতিতে দারুচিনি এবং মধু খুব ভালো কাজ করে।

মধুতে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হৃদযন্ত্রের ভেতরের প্রদাহ কমাতে কার্যকর। ফলে কমে যায় হার্টঅ্যাটাকের সম্ভাবনা। মধুতে থাকা পর্যাপ্ত পরিমাণ ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট শরীর থেকে টক্সিক উপাদান বের করে ক্যান্সার কোষের জন্ম প্রতিরোধ করে।

আর দারুচিনিতে থাকা অ্যান্টি-টিউমার উপাদান শরীরে টিউমার হওয়া প্রতিরোধ করে। নিয়মিত দারুচিনি এবং মধু গ্রহণে পেটে জমে থাকা গ্যাস বেরিয়ে যায়। সেই সঙ্গে হজম ক্ষমতারও উন্নতি হয়।

দারুচিনি চা খাওয়ার নিয়মঃ

দারুচিনি চা খাওয়ার নিয়ম
দারুচিনি চা খাওয়ার নিয়ম
  • দারুচিনি গুঁড়ো ২ টেবিল চামচ,
  • খাঁটি মধু দেড় টেবিল চামচ এবং
  • পানি ২ গ্লাস

প্রথমে ২ গ্লাস পানি ২০-৩০ মিনিট ফুটিয়ে তাতে ২ টেবিল চামচ দারুচিনি গুঁড়ো দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে ১৫ মিনিট ঢেকে রেখে দিন। তারপর সেটাতে দেড় টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে এক গ্লাস সকালে খালি পেটে আর এক গ্লাস রাতে ঘুমানোর আগে পান করুন।

সকালে খাওয়ার পর বাকি এক গ্লাস যদি ফ্রিজে রাখতে চান তাহলে রাতে যখন পান করবেন, তার আধা ঘণ্টা আগে ফ্রিজ থেকে বের করে রাখুন, তারপর পান করুন।

বেশি দারুচিনি খেলে কি হয়?

যদিও দারুচিনি চা অনেক চিত্তাকর্ষক উপকার সরবরাহ করে, এর কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। অতিরিক্ত পরিমাণে দারুচিনি চা খাওয়া লিভারের পক্ষে খুব বিপজ্জনক এবং এমনকি লিভারের ব্যর্থতার কারণ হতে পারে।

এটি কুমারমিন নামক একটি সক্রিয় পদার্থের উপস্থিতির কারণে ঘটে। প্রতিদিন ১-২ কাপ দারুচিনি চা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এর বেশী অভ্যাস গড়ে তোলা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

দারুচিনি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। ঈস্ট ছত্রাক ঘটিত ইফেকশন প্রতিরোধ করতে দারুচিনি গুণাবলী চমৎকার ভাবে কাজ করে।

Read more:

5/5 - (17 Reviews)

Leave a Reply

Your email address will not be published.