আয়রন সমৃদ্ধ খাবার তালিকা ও এর অভাবে কি হয়

আয়রন সমৃদ্ধ খাবার তালিকা সম্পর্কে আপনার পরিপূর্ণ জ্ঞ্যান থাকা জরুরি। আয়রনের ঘাটতি আমাদের শরীরে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে। তাই আমরা আজকের পোস্টে এই বিষয়ে কথা বলব।

আয়রন এমন একটি পুষ্টি উপাদান বা মিনারেলস যেটি আমাদের নিত্যদিনকার খাবারে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মিনারেলস এর অভাবে রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যায় কারণ আয়রন হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে এবং হিমোগ্লোবিন আমাদের শরীরের জন্য, শরীরে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত প্রবাহের জন্য কতটা জরুরি তা আমরা সবাই জানি।

রক্ত কমে যাওয়ার ফলে শরীরে রক্তশূন্যতার পাশাপাশি থ্যালাসেমিয়ার মতো জটিল রোগ সৃষ্টি হয়। একজন শিশু থেকে পূর্ন বয়স্ক সকলেরই আয়রন এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একটি পরিসংখ্যান এ দেখা গিয়েছে একজন ব্যক্তি যার বয়স ১৯-৫০ তার দৈনিক ১৮ মিলিগ্রাম আয়রন এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ১৯ এর নিচে যাদের বয়স তাদের দৈনিক ৮ মিলিগ্রাম এবং গর্ভবতী নারীদের দৈনিক ১১ মিলিগ্রাম আয়রনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

গর্ভবতী নারীদের গর্ভের প্রথম তিন মাস থেকেই আয়রন সমৃদ্ধ ট্যাবলেট খেতে দিয়ে থাকেন ডাক্তারেরা। কারন তখন শুধুমাত্র খাবারেও আয়রন এর ঘাটতি পূরণ সম্ভব হয়না। মা ও শিশু দুজনের জন্যই তখন ফলিক এসিড অনেক জরুরি হয়ে থাকে।

আরো জানুনঃ গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা, মাস অনুযায়ী ডায়েট প্ল্যান

যাদের আয়রন এর ঘাটতি দেখা দেয় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তাদের আয়রন সাপলিমেন্ট বা আয়রনের ঔষধ খেতে হয়। অনেকের জন্মগত ভাবেই শরীরে রক্তের ঘাটতি থাকতে পারে।অনেকের বয়স বাড়ার কারণে শরীরে রক্তের উৎপাদন কমে যায়। এই অবস্থায় ডাক্তার তাদের আয়রন ট্যাবলেট খেতে দিয়ে থাকেন। এইসব ট্যাবলেট গ্রহণ এর পাশাপাশি যেকোনো মানুষেরই আয়রন সমৃদ্ধ খাবার ও সাথে সাথে খেতে হয়। তাহলে এই সমস্যা থেকে অতি জলদি পরিত্রাণ লাভ করা যায়।

আয়রন সমৃদ্ধ খাবার তালিকা

নিত্যদিনকার খাবার ম্যানু তে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার যোগ করা উচিত। এর জন্য জেনে নেয়া প্রয়োজন কোন কোন খাবারে আয়রন রয়েছে এবং কি পরিমাণে রয়েছে।

প্রকৃতিতে আয়রন দুই ভাবে পাওয়া যায়। হিমি আয়রন যা বিভিন্ন ধরনের মাংসে পাওয়া যায়।এবং উদ্ভিজ্জ আয়রন যা বিভিন্ন শাকসবজি ফলমূল বা শুকনো খাবার যেমন ড্রাই ফ্রুটস এ পাওয়া যায়।

উচ্চ মাত্রায় আয়রনযুক্ত খাবারের তালিকা অর্থাৎ যে সকল খাবারে লৌহ জাতীয় মিনারেলস রয়েছে এমন খাদ্যের পুষ্টিমান সহ তালিকা নিচে দেয়া হলো।

আমরা কিছু সাধারণ আয়রন সমৃদ্ধ খাবার এর নাম সবাই জানি। যেমন কলিজা, যার ৪ আউন্স এ ৭ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে। ডিমের কুসুমে ০.৫ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে এবং গরুর ও মুরগির মাংস তে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে যা বাংলাদেশী খাবার ম্যানু তে সপ্তাহে প্রায় ২-৩ দিন থাকেই।

সবুজ শাকসবজি এর মধ্যে পালংশাক, টমেটো, মিষ্টি কুমড়ো তে আয়রন রয়েছে। ফলের মধ্যে আনার বা ডালিম, বিট, কালো আঙ্গুর, আপেল এর মধ্যে ও প্রচুর আয়রন রয়েছে। মধ্যম সাইজের একটি আপেলে আয়রন থাকে ০.৩১ মিলিগ্রাম।

এবং এগুলো আয়রন জনিত সমস্যা সমাধানে দারুন কার্যকরী।

আয়রন সমৃদ্ধ ফল এবং সবজির এ তালিকায় আয়রন যুক্ত সবজি ও আয়রন সমৃদ্ধ ফল গুলোর কোনটিতে কি পরিমাণ আয়রণ আছে দেখে নিন।

খাদ্য উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রামে আয়রন রয়েছে :

আনার বা ডালিম ০.৩ মিলিগ্রাম
পালংশাক ৪ মিলিগ্রাম
এলাচ ৪.৬ মিলিগ্রাম
নারিকেল ৪.৭মিলিগ্রাম
দেশি মুরগির ডিমের কুসুম ৪.৮ মিলিগ্রাম
মটর ডাল উভয়ের ৪.৮ মিলিগ্রাম
সবুজ কচুশাক ৪.৯ মিলিগ্রাম
লাল আটা ৪.৯ মিলিগ্রাম
বাদাম ৫ মিলিগ্রাম
মসুর ডাল ৫.১ মিলিগ্রাম
পেস্তা ও খেসারির ডাল ৫.৩ মিলিগ্রাম
সিমের বিচি ৫.৪ মিলিগ্রাম
লালশাক ৬ মিলিগ্রাম
জলপাই ৬.২৮ মিলিগ্রাম
চিড়া ৬.৮ মিলিগ্রাম
মুগডাল ৭.২ মিলিগ্রাম।
দারচিনি গুড়া ৮.৩ মিলিগ্রাম
ডাটা শাক ৮.৪ মিলিগ্রাম
ছোলার ডাল ৮.৮ মিলিগ্রাম
সরিষা ৮.৯ মিলিগ্রাম
পাটশাক ৯.৭মিলিগ্রাম
তিল ১০.৫ মিলিগ্রাম
ধনিয়া ১৭.৯ মিলিগ্রাম
হলুদ ৩৩.২ মিলিগ্রাম।
তেজপাতা ৪৩ মিলিগ্রাম।

আয়রনের অভাবে কি কি রোগ হয় এদের উপসর্গ

আয়রন এর ঘাটতি সহজেই ধরা পড়ে না। তাই এর এক বা একাধিক উপসর্গ গুলো আগে থেকেই জেনে নিতে হবে এবং এর একাধিক লক্ষণ প্রকাশ পেলেই ডাক্তার এর শরানাপন্ন হয়ে একবার হিমোগ্লোবিন বা রক্তশূন্যতার অন্যান্য টেস্ট করে নিতে হবে।

শরীরে মিনারেলস এর ঘাটতি হলেই আয়রন ডেফিসিয়েন্সি দেখা দেয়। এর ঘাটতি তীব্রতর হলে অনিমিয়া, থ্যালাসেমিয়া বা হার্টের রোগ দেখা দেয়।

আয়রন এর ঘাটতির কারণে মানুষের শরীরে নিম্নলিখিত উপসর্গগুলো দেখা দেয়:

  1. শরীর হঠাৎ দুর্বল হয়ে যেতে পারে
  2. আপনার নখ হঠাৎ কি নরম হয়ে গিয়েছে
  3. জিহবা হঠাত ফুলে উঠতে পারে
  4. মাথা যন্ত্রণা হতে পারে, কিন্তু এটি সাইনাস বা মাইগ্রেন এর জন্য ও হতে পারে।তাই টেস্ট করে নিতে হবে।
  5. অল্প পরিশ্রমে হাপিয়ে যাওয়া এবং একটু হাঁটলেই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
  6. হঠাৎ হঠাৎ হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
  7. হঠাৎ হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
  8. চুল পড়া
  9. শরীরে জ্বরভাব থাকা
  10. শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া

এইসব উপসর্গ প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকলে দেরি না করে অবশ্যই ডাক্তারের শরানাপন্ন হতে হবে।

আয়রন এর সমস্যা কোনো জটিল সমস্যা নয়। কিন্তু যদি দীর্ঘদিন কেউ এই সমস্যা নিয়ে পড়ে থাকে এবং এর প্রকৃত চিকিৎসা সময় থাকতেই না নেয়া হয় তাহলে সেটি মারাত্মক ক্ষতির দিকে যায়। এই সমস্যা জটিল আকার ধারণ করলে মানুষের শরীরে অন্যের রক্ত দিতে হয়। যা সবসময় শরীরের জন্য ভালো হয়না।

অন্যের রক্ত গ্রহণের ফলে অনেকের শরীরে বিরুপ প্রতিক্রিয়া ও দেখা দিতে পারে। অনেক গর্ভবতী নারীদের শেষের দিকে ডেলিভারির পূর্ব মূহুর্তে হঠাত করেই এই সমস্যা দেখা দেয়। তাদের তখন দ্রুত সময়ে রক্তের ব্যবস্থা করে দিতে হয়। এতে তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব বিস্তার না হলেও অনেকেরই গর্ভকালীন সময়ে পরমুহূর্তে শরীরের নানা রকম প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

তাই আমাদের চেষ্টা করতে হবে অন্যের রক্ত গ্রহণ বা ট্যাবলেট গ্রহণ এর থেকে আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের মাধ্যমে শরীরে আয়রনের ব্যালেন্স ঠিক রাখা। আশা করি আমাদের এই আয়রন সমৃদ্ধ খাবার তালিকা থেকে আপনার পছন্দের খাবারগুলো আপনার নিত্যদিনের ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করবেন।

আরো পড়ুনঃ

5/5 - (14 Reviews)
Subna Islam
Subna Islam
Articles: 36

Leave a Reply

Your email address will not be published.